অন্যায়ের প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ছাত্র সমাজ সংগঠিত হোন

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস অন্যায়-অবিচার-শোষন-বঞ্চনার ইতিহাস। পার্বত্য
চট্টগ্রামের আদিবাসী জাতিসত্তাসমূহের ওপর ৪৭ এ ভারতবর্ষ দেশ ভাগের পর
পাকিস্তানি শাসকরা শোষন-বঞ্চনা-নির্যাতন চালিয়েছিল এবং ৭১ এ বাংলাদেশ
স্বাধীনতা লাভের পর শুরু হয় উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের শোষন-বঞ্চনা-নির্যাতন
এবং যা এখনো চলমান। পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের পাতা খুললে দেখতে পাবেন,
পাহাড়ী জনগণের ওপর গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, লাভ জিহাদ, বিচার বর্হিভুত হত্যা
ইত্যাদি ঘটনা রয়েছে যা মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কিত এবং সাম্প্রদায়িক এবং
বর্ণবাদী সম্পর্কিত বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশ সংবিধানে মূলনীতি চারটি।
অসাম্প্রদায়িকতা হচ্ছে চারটি মধ্যে একটি মূলনীতি। কিন্তু সংবিধানে থাকলেও
পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে বাস্তবরূপ দিতে পারেন নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম
“Divided and Rule” অর্থাৎ ভাগ কর, শাসন কর ব্রিটিশ নীতি এখনো চলমান রয়েছে।

Life is not ours নামে তদন্ত কমিশনের রিপোর্টটিতে কিছুটা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত
পাহাড়ি জনগণের জীবন ও জীবিকার যে চিত্রটি পাওয়া যায় সে চিত্র একটি গণতান্ত্রিক
সরকারের অধীনস্থ কোন গণতান্ত্রিক সমাজের চিত্র নয়। সে চিত্র হল বন্দীশালার এবং
এক বিশাল সামরিক ক্যাম্পের।
Chittagong Hill Tracts Regulation 1890 –  এ পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন
পাহাড়ী জাতিসত্তাভুক্ত জনগণের জন্য যে সব অধিকার সংরক্ষিত ছিল এবং ঐ অঞ্চলে
বাইরের লোকদের প্রবেশ ও বসতি স্থাপনের ওপর যে বিধি নিষেধ ও নিয়মকানুন ছিল,
সেগুলো ১৯৬৪ সাল থেকেই উঠিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা হয়। তখন থেকেই পার্বত্য
চট্টগ্রামকে একটি মুসলমান অঞ্চল করার যে অগণতান্ত্রিক নীতি নির্ধারণ করা হয়,
সেই নীতিই বাংলাদেশ একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার
প্রথমে আওয়ামী লীগ সরকার এবং তারপর থেকে প্রত্যেকটি সরকারই অনুসরণ ও কার্যকর
করে আসছে। এই দুই পর্যায়ের মধ্যে পার্থক্য এই যে, প্রথমে যেখানে লক্ষ্য ছিল
অঞ্চলটিকে একটি মুসলমান -প্রধান অঞ্চলের পরিণত করা, সেখানে বাংলাদেশ আমলে
লক্ষ্য হল, অঞ্চলটিকে একটি বাঙালি-প্রধান অঞ্চলে পরিণত করা। কিন্তু বাস্তবত এই
পার্থক্য কোনো পার্থক্যই নয়, কারণ পাকিস্তান আমলে যে মুসলামনদের প্রবেশ সেখানে
ঘটতে শুরু করেছিল তারা ছিল মূলত বাঙালি এবং এখন সেখানে যে বাঙালিদের বসতি
স্থাপনের নীতি কার্যকর করা হচ্ছে সে বাঙালিরা মূলত মুসলমান।
[বদরুদ্দীন উমর; বাংলাদেশ জাতিগত সংকট ও উত্তরণের উপায়]

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী জনগণের ওপর যে নির্যাতন, অত্যাচার, বঞ্চনা তথা
নারী ধর্ষণ, বিচার বর্হিভুত হত্যা, ভূমি বেদখল, পর্যটন সম্প্রসারণ, নিরাপত্তা
নামে সেনা-বিজিবি ক্যাম্প সম্প্রসারণ, ব্যবসায়-বিভিন্ন কোম্পানি নামে যে অবৈধ
অনুপ্রবেশ এটি বন্ধ করা না গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জাতিসত্তাসমূহের
অস্তিত্ব টিকে রাখা সম্ভব হবে না। এরই পাশাপাশি ইটভাটা বৃদ্ধি, তামাক চাষ
বৃদ্ধি হচ্ছে পরিবেশ বান্ধব ব্যবসায় নয়। নারীদের নিরাপত্তা অভাব। কৌশলে
ভূসম্পত্তি দখল। ব্যবসায়-বাণিজ্যে ক্ষেত্রে আদিবাসীদের নায্য মূল্য থেকে
বঞ্চিত। দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে টাকা ধার বা ঋনের দিয়ে মহাজন বা বাঙালিরা
চড়াসুদে আদায়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা রাজনৈতিক সমস্যা বা জাতীয় সমস্যা। এটি সমাধানের
লক্ষে ২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ওরফ হতে পাবর্ত্য
চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি এবং পাবর্ত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী পক্ষ হতে
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়; যা পার্বত্য
চট্টগ্রাম চুক্তি নামে পরিচিত। আজ ২০ বছর অতিবাহিত হচ্ছে কিন্তু এখনো চুক্তি
পূর্নাঙ্গ বাস্তবায়ন করা হয়নি।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ২০০১ সালে “পার্বত্য
চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন” গঠন করা হলে আইনগুলো কার্যকর হয়নি। ফলে
দিন দিন প্রকট আকারে বাড়ছে জোরপূর্বক ভূমি বেদখল। ভূমি সমস্যা সমাধান না হলে,
ভূমি হারাতে থাকবে পাহাড়ী জনগণ আর ভূমি হারাতে থাকলে পাহাড়ী জনগণের টিকে থাকা
কঠিন হয়ে পড়বে এবং হচ্ছে। আদিবাসী জাতিসত্তা বেঁচে থাকা মূল দরকার ভূমি। তাই
ভূমি আদিবাসীদের মা সমতুল্য। ভূমি আদিবাসীদের জীবন।

২০১৭ সালে আদিবাসী জাতিসত্তাসমূহের পাঁচটি জাতির জন্য  মাতৃভাষা শিক্ষা
প্রি-প্রাথমিক অর্থাৎ  “জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের” অন্তর্ভূক্ত
করা হলে ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক অভাবের ফলে সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হচ্ছে না।
কিন্তু একটি জাতি পরিচয় পরিচিত হয় তার মাতৃভাষা মাধ্যমে। কিন্তু আদিবাসীদের
মাতৃভাষা এবং বর্ণমালা ব্যবহার ও চর্চার অভাবে এবং উদাসীনতা ফলে হারিয়ে যাচ্ছে
ধীরে ধীরে।

যে জাতিতে নারী ধ্বংস হয়, সে জাতি ধ্বংস হতে বাধ্য। সে পরিপ্রেক্ষিতে পার্বত্য
চট্টগ্রামকে পর্যটন জোন তৈরি করা হয়। আমাদের আশে পাশে দেশের তাকালে দেখতে
পাবেন, পর্যটন সাথে যৌন ব্যবসায় সম্পৃক্ত থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ক্ষেত্রে
আদিবাসী নারীদের সে কাজে সম্পৃক্ত করা হয়। এভাবে আদিবাসী দিন দিন ধ্বংস হচ্ছে।

অর্থাৎ পৃথিবীর বুকে একটি জাতিকে টিকে যে মূল তিনটি স্তম্ভ মাতৃভাষা,
মাতৃজাতি, মাতৃভূমি সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

একটা সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে তথা পার্বত্য জনগোষ্ঠীর
ওপর শোষণ, তাদের সম্পদ লুন্ঠন, কাপ্তাই বাঁধের কারনে তাঁদের ব্যাপক
বাস্তুচ্যুতি, নির্বাচন, সেনাবাহিনী দমন-পীড়ন নীতি, লোগাং হত্যাকন্ডের মত
নৃশংস ঘটনা, পার্বত্য এলাকা বাঙালি জনগোষ্ঠীর অভিবাসন এ সকল ঘটনা এক যোগে
পার্বত্য এলাকা বা চট্টগ্রামের বিরাজমান সংকটের একটা দিক।[শান্তিচুক্তি ও
নির্বাচিত নিবন্ধ; আহমদ ছফা]

আমাদের সমাজ অন্যায়-অবিচার ভরপুর সমাজ। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে সমাজ
অন্যায়-অবিচার-নির্যাতন-নিপীড়ন তথা অর্থনৈতিক শোষণ-বঞ্চনা, রাজনৈতিক উৎপীড়ন
এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ভরপুর সমাজ। পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সমস্যা সেটি কোন
একক জাতি তথা শুধু মাত্র মারমা বা ত্রিপুরা বা চাক বা চাকমা সমস্যা নয়। সেটি
সকল আদিবাসী তথা ১১ জাতিসত্তাসমূহের সমস্যা। অর্থাৎ অভিন্ন বা একই শাসন শোষণের
শিকার এবং শত শত বছর পাহাড়ী জনগণ সকলেই জাতীয় সামন্ত প্রভুদের নির্মম ও
অগণতান্ত্রিক শাসন শোষণের সমভাবে নিষ্পেষিত এবং আমাদের অভিন্ন জীবন ধারণ
পদ্ধতি। ফলে কোন একটি একক জাতি পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। তাই সমস্যা
সমাধানের লক্ষ্যে সকল আদিবাসী জাতিসত্তাসমূহ সম্মিলিত হওয়া চায়। এরই পাশাপাশি
পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্যায়-অবিচার-শোষন-বঞ্চনা বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ
গড়ে তোলার জন্য ছাত্র সমাজ সংগঠিত হোন অর্থাৎ যে সকল স্ব-স্বজাতি মধ্যে ছাত্র
সংগঠন বা সামাজিক সংগঠন রয়েছে সকলে সংগঠিত হোন।

শেয়ার করুন

ব্লগার উথোয়াইনু মারমা

I'm student.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।