সিস্টার, দ্যা লেডি অব পিস

()

রাত ১ টা ছুঁই ছুঁই।

শ্যামলী ওভারব্রিজ।

ঢাকা শহরের ব্যস্ততম ওভার ব্রিজগুলোর মধ্যে একটি। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আলোকিত রাজপথ। রাস্তায় জনমানুষের অস্তিত্ব চোখে পড়ে না। সশব্দে Pulsar 150 C&G মডেলের বাইক এসে থামল শ্যামলী সিনেমা হলের সামনে। বাইকের ট্যাঙ্কিতে বসা চার পাঁচ বছরের একটা ফুটফুটে মেয়ে। চোখে রাজ্যের বিস্ময় নিয়ে সে লকডাউনের শহর দেখে। মাঝেমধ্যে পাপা পাপা বলে খিলখিল করে হাসে। দুর্বোধ্য আওয়াজ করে। মন্থর গতিতে একটা পুলিশ পিকআপ এসে থামল শ্যামলী হলের সামনে।পিকআপের নীল রঙের বডিতে সাদা কালিতে লেখা আদাবর থানা। আসুরিক গতিতে সুনশান রাতের নিরবতা ভেঙে ছুটে চলছে উত্তরবঙ্গগামী ট্রাক-লরি। কয়েকটা প্রাইভেট গাড়িও সা সা করে ছুটে যাচ্ছে। পুলিশ ভ্যানের সামনে সিটে বসে থাকা অফিসার নামে না। নামে দুই জন হাবিলদার। সন্দিগ্ধ চোখে তাকায় বাচ্চা সমেত বাইক চালকের দিকে। জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে তারা বোধহয় হতোদ্যম হল। বাইকের হ্যাড লাইটে ওপরে লাগানো লাল স্টিকারে হলুদ রঙে লেখা প্রেস। তাতে বাংলাদেশের প্রথম সারির একটি পত্রিকার মনোগ্রাম। তাছাড়া হাবিলদাররাও মোটামুটি মানুষ চেনে। কে চোর , কে সাধু। অমিত পুলিশের গতিবিধি তেমন গা করে না। কারণ সে ক্রাইম রিপোর্টার। রাতের আঁধারে তার চলাচল। থানায় থানায় তার নিত্য আসা যাওয়া। তার ছোট্ট মেয়েটার সাথে মিষ্টি খুনসুটিতে মাতে অমিত। একজন হাবিলদার প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরাল। লম্বা একটা সুখ টান দিয়ে একদলা ধুঁয়া আকাশে ফুঁকে দিল। সাদা ধুয়ার কুণ্ডলী বেশিক্ষণ থাকল না। বেশ জোরেই বাতাস বইছে। হঠাৎ বৃষ্টি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা।

নেনে ভাই , টানেন। নিজের অর্ধেক খাওয়া সিগারেট সঙ্গীকে অফার করে প্রথমজন। অপরজন শশব্যস্ত হয়ে বলে– না না ভাইজান। সিগারেট খাওন ছাইড়া দিছি। কালকা আজহারী সাহেবের ওয়াজ শোনার পর তওবা করছি। আর সিগারেট মুখে নিমু না। তাছাড়া আপনের ভাবিও বকাঝকা করে। সকালে ফেইসবুকে দেখলাম দু’মুঠো ভাতের জন্য ভুখা মিছিল করছে কত মানুষ। খাবার না পায়া কত লোক মারা যাচ্ছে। তাই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছি আর ধুঁয়া ফুঁকে টাকা বরবাদ করব না। অপর সঙ্গীর মনের প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করে বুঝা গেল না , তবে তিনি তৎক্ষণাৎ অর্ধেক খাওয়া সিগারেটা ছুঁড়ে ফেললেন। বুটের চাপে আগুনটা নেভালেন। তারপর মুখে মাস্ক লাগিয়ে পিকআপে গিয়ে উঠলেন। গুড়গুড় গতিতে গাড়িটা রিং রোডের দিকে মোড় নিল।ওভারব্রিজের সিঁড়ির নিচের জায়গাটায় একটা করমচা গাছে। তাদে ফুল ফুটেছে। করমচা ফুল দেখতে অনেকটা শিউলি ফুলের মত। অমিত তার মেয়ের সাথে মেতে ছিলেন। এমন সময় খিলখিল আওয়াজের অট্টহাসহ্যে সে ধাতস্থ হল। বোরকা পড়া এক মহিলা তার গাঘেঁষে দাঁড়িয়েছে।

অমিতই আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল :

: আপনার নাম কি ?

: নাম শুনে কাম কি ?

: কাম তো হতেও পাড়ে।

: আপনি যে কামের লোক না, তা আমার বুঝা শ্যাষ।

: আচ্ছা, কেমন করে বুঝলেন ?

: নিজের মেয়েরে ধইরা কেউ কাম করতে আহে নাকি ছার। বলেই আবার অট্টহাসিতে নিরব পরিবেশটা গমগমিয়ে দিল । হাসির শেষ রেশটুকি কেমন যেন করুণ কান্নার মত টেকল অমিতের কানে।

: এখন তো পুরো শহর লকডাউন, তবুও তুমি বেরিয়েছ।

: প্যাট তো লকডাউন ঠকডাউন মানে না ছার।

তাদের কথার মাঝখানেই একটা এ্যাম্বুলেন্স এসে থামল। রাতের অতিথি চোখের পলকে অন্তর্ধান হয়ে গেল। এ্যাম্বুলেন্সের দরজা খুলে ঈষৎ নীল বর্ণের পিপিই মোড়ানো রবোটিক টাইপের একজন মানুষ এসে বাইকের কাছে দাঁড়াল। অমিত কৌতুক মিশ্রিত গলায় বলল —

: একি, তুমি এ্যাম্বুলেন্সে করে এলে যে ? তুমি কি আসলেই আমার সেলিনা, নাকি আবার ভূত টূত ?

: আর বলো না, কাজের চাপে মরে ভূত হওয়ার যোগাড়। স্টাফ গাড়ির ট্রাইভার ছুটিতে আছে। অগত্যা এ্যাম্বুলেন্সে আসতে হল।

পরিচিত গলার আওয়াজ পেয়ে মেয়েটা মা মা করে হুমড়ি দুমড়ি করে কোলে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল।

: এ্যই, ওকে ধর ধর। একেবারে গোসল টোসল না করে কোলে নেয়া যাবে না। কি এক ভাইরাস। আমার পিপিইতে যে করোনার জীবাণু লেগে নাই তার কি গ্যারান্টি !

: হুম ঠিক বলেছ। আজ সারাদিন তার দাদিকে খুব জ্বালিয়েছে। সেই বিকেল থেকেই নাকি মা মা করে কান্নাকাটি করেছে। সেলিনার মনের গভীর গহন থেকে একটা দীর্ঘশ্বাসের বের হয়ে আসে।

আমার শরীরটা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে বলতে বলতে অমিতের ডান কাঁধে হাত রেখে ব্যাক সিটে বসে সেলিন। মেয়েকে সামলিয়ে বাইক স্টার্ট দেয় অমিত। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আলোকিত রাতের রাজপথে মাড়িয়ে এগিয়ে যায় তারা আপন আলয়ে। অমিতের ঘুম ভাঙল বেলা ১১ টায়। বিছানায় শুয়ে চোখ মেলে দক্ষিণ দিকের জানাটায় তাকায় সে। ঘুম ভেঙেই জানালার দিকে তাকিয়ে থাকা তার অভ্যাস হয়ে গেছে। আধো ঘুম আধো জাগ্রত অবস্থায় কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তারপর আড়মোড়া ভেঙে ওয়াশরুমে যায়। আজ আচমকা সেলিনাকে জানালায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ধাক্কা খেল অমিত। তার তো এ সময় বাসায় থাকার কথা না। সেলিনা অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে জানালা লাগোয়া কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে। লাল ফুলে থইথই গাছটা। তার দু’চোখের অশ্রুধারা থুতুনিতে জমে ফোটায় ফোটায় ঝরছে মোজাইক করা মেঝেতে। অমিত চোখ বন্ধ করে অনুমান করার চেষ্টা করল। সেলিনার মন খারাপের হেতু কি হতে পারে ? সেলিনা বেশ শক্ত প্রকৃতির মেয়ে। সে পান্থপথের দিকে একটা স্বনামধন্য প্রাইভেট হাসপাতালের নার্স। সেলিনাকে বিয়ে করতে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয় অমিতক। তার মরহুম পিতা জীবনের অন্তিমকাল পর্যন্তও ছেলের বউ হিসেবে একজন নার্সকে মেনে নিতে পারেনি। প্রতিবেশী, বন্ধুমহল, শ্বশুর বাড়ির কানাঘুষা শুনে অভ্যস্ত সেলিনা। কিন্তু আজ হঠাৎ কি হল ? চিন্তা করে কোন কূল কিনারা পেল না অমিত। নিঃশব্দে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশরুমে ঢোকে। ফ্রেস হয়ে মায়ের রুমে যায় । দাদি নাতি মিলে মিষ্টি খেলায় মেতেছে।

তাই তাই তাই

মা মা বাড়ি যাই

মামি দিল দুধভাত

পেট পুরে খাই।

তিতলিকে কোলে তুলে আদর করে অমিত। ব্যাডরুমে এসে দেখে সেলিনা বসে আছে। আলুথালু চুলে তাকে বেশ স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে।অমিত তাকে জড়িয়ে ধরতে হাত বাড়ায়। কিন্তু সেলিনা তাকে এক রকম ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল। ঘটনার আকস্মিকতায় অমিত আশ্চর্যবোধক চোখে চেয়ে আছে। তোমরা কেউ আমাকে ছোঁবে না। আমি বোধহয় করোনা এফেক্টেড হয়ে গেছি অমিত। প্রায় সবগুলো লক্ষণই আমার শরীরে উপস্থিত। সারা রাত আমার চিন্তায় ঘুম হয়নি। বলেই হু হু করে কান্নায় ভেঙে পড়ে সেলিনা।আচ্ছা আগে রিপোর্ট তো আসুক তারপর নাহয় কেঁদ। তুমি না রোগীদের অভয় দাও, তাদের বেঁচে থাকতে প্রলুব্ধ কর। তুমিই যদি এমন হতাশ হও, তাহলে কে তোমাকে বুঝাবে বল। মাঝখানে বিভীষিকাময় দুটি রাত অতিবাহিত হয়ে যায়। আজ অন্য রকম সকাল। চৈত্রের সোনাঝরা রোদে আলোকিত পারিপার্শ্বিকতা। ঘুম থেকে উঠেই ইলিশের ম ম করা গন্ধ পায় অমিত। বিছানা থেকে নেমেই কিচেনে উঁকি দেয়। সেলিনা মনোযোগ দিয়ে সর্ষে ইলিশ রান্না করছে। তিতলি এক হাতে পুতুল আর অন্যহাতে মায়ের শাড়ির নিচ দিকটা ধরে আছে ।

 

: এই যে সিস্টার কি রান্না হচ্ছে ?

: তোমার প্রিয় সর্ষে ইলিশ।

: ওয়াও। তোমার হাতে সর্ষে ইলিশ মানে…

: থাক থাক। আর পাম দিতে হবে না।

: লোকে তোমাকে বলে সিসটার, কিন্তু আমি তোমার নতুন একটা পদবী দিলাম—

লেডি উইথ দ্য সর্ষে ইলিশ ! বলেই হা হা করে হেসে উঠল অমিত।

:তোমার আজ ডিউটি নেই ?

: নাহ, ছুটি নিয়েছি আজ। আচ্ছা, রাতে যে তোমারা কাছে রিপোর্টগুলো দিলাম কই রেখেছে ? পাচ্ছি না।

: আরেহ ওসব রিপোর্ট আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি। ঐ রিপোর্টগুলো কি আর ফেলনা বল। যা ধকল গেল এই দু’দিন। সত্যি সেলি তোমার করোনা টেস্ট নেগেটিভ আসায় আমি যে কি খুশি হয়েছিলাম তখন, বলে বুঝানো যাবে না। গভীর আস্থা আর ভালোবাসার চোখে অমিতদের দিকে তাকায় সেলিনা। তারপর বলল—

: হয়েছে হয়েছে এখন যাও ফ্রেশ হয়ে আস। সব রান্না বান্না কমপ্লিট।

অমিত মুখ ফেরাতেই তিতলি পাপা পাপা বলে তারস্বরে কেঁদে উঠল। সাথে সাথে অমিত আর সেলিনা হা হা করে শশব্দে হেসে উঠল।

 

উৎসর্গ : এই ভীষণ মহামারির দিনে কর্মরত সকল নার্সকে 💚

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 4
    Shares

লেখক হুসাইন দিলাওয়ার

লেখক ও সাহিত্য সংগঠক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: এই ব্লগের লেখা কপি করা যাবে না