রাজাহীন রাজারকূল

()

একটি ছোট পাহাড়ি নদী সুদূর বার্মা থেকে ঘুরতে এসেছিল বাংলাদেশের একটি গ্রামে। নদীটি ঐ গ্রামের মায়ায় এতই ডুবে গিয়েছিল যে, তাঁর আর নিজ দেশে ফেরা হয় নি। সেই নদীর নাম বাঁকখালি। সেই গ্রামের নাম রাজারকুল। ও আপনি ভাবছেন- এতো কিছু আমি কিভাবে জানি? হুম, আমি জানি কারন আমার গ্রামের পাশেই রাজারকুল।  দুই গ্রামের মাঝখানে রাজারকুলের মায়ায় আচ্ছন্ন বাঁকখালি। আমিও বাঁকখালির মতন রাজারকূলের মায়ায় আচ্ছন্ন ছিলাম। নদীর এই কূলে বসে মনে মনে ভাবতাম- ঐ কূলে রাজারকূল, ওখানে নিশ্চয় রাজারা থাকে। ঐ কূলে আছে রাজার প্রসাদ, রানীর সৌন্দর্য, যুদ্ধের ঘোড়া। এই সব ভাবতে ভাবতে কত সন্ধ্যা আমাকে নিয়ে গেছে তাঁর সময়হীন জগতে। যেই জগত থেকে ফেরার পর যখন বাড়িতে ফিরতাম তখন দেরিতে বাড়ি ফেরার অপরাধে মায়ের হাতের মাইর আমার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো। তবুও রাজারকূল নিয়ে আমার ভাবনার কমতি নেই। মায়ের হাতের সেই সব মাইর ক্রমান্বয়ে আমাকে আরও বেশী রাজারকূলের নেশার দিকে ঠেলে দেয়।একদিন মধ্য দুপুরে, সমস্ত সাহস এক করে, স্কুল পালিয়ে, নেশায় বুদ হয়ে রওনা দিলাম নদীর ঐ পাড়ে- রাজারকূলের দিকে। এক অনন্ত জগত আমার চোখের ভিতর চোখ হয়ে পথ দেখাচ্ছে। অতঃপর নদীর এই পাড় থেকে নৌকায় উঠলাম। নৌকার মাঝিকে ফিল্মের নায়কের মতন লাগছিল কারন সে আমাকে পৌঁছে দিবে রাজার রাজ্যে। বিভিন্ন চিত্রকল্প আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাই নদীর স্রোতে। মাথার উপর উতপ্ত সূর্য। পানির উপর ছুটাছুটি করছে কিছু ছোট ছোট পাখি যারা জানে রাজারকূলের আসল রহস্য। কারন নদী পার হওয়া তাদের কাছে পুতুল খেলার মতন সহজ। হাজারো জল্পনা-কল্পনা শেষে অবশেষে নদী পার হলাম। অতঃপর আমি এসে পড়লাম সেই কুলে-যে কূলে রাজা থাকে। এখানকার মানুষগুলো কাজে ব্যস্ত। মানুষগুলোর প্রতি আমার তেমন আকর্ষণবোধ কাজ করলো না কারন এরা ঠিক আমাদের এলাকার কানু কাকা, সিদুল দাদার মতন। আমার মূল লক্ষ্য হল- রাজা ও তাঁর প্রসাদ। হাঁটছি তো- হাঁটছি। অপার বিস্ময় ও আনন্দে। ছোট ছোট জীর্ণ শীর্ণ কিছু ঘর চোখে পড়ল। মনে মনে ভাবলাম-নিশ্চয় এগুলো প্রজাদের বাড়ি। সেই সব বাড়ির আশ পাশে আমার বয়সী অনেক বাচ্চা কাচ্চা দেখলাম। তাদের প্রতিও আমার কোন আকর্ষণ কাজ করলো না কারন আমার মূল লক্ষ্য হল- রাজা ও তাঁর প্রসাদ। সেই রাজা ও তাঁর প্রসাদ খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছে গেলাম একটি বিশাল পাহাড়ের নিচে। অদ্ভুদ এক পাহাড়। কিছুটা অন্ধকারচ্ছন্ন, কিছুটা গাম্ভীর্যপূর্ণ, কিছুটা ভয়ংকর। মাঝে মাঝে ভেসে আসছে হরেক রকম শব্দ। থমকে গেলাম পাহাড়ের পাদদেশে। মনে মনে ধরে নিলাম এটাই সেই পাহাড় যেই পাহাড়ের মাথায় আছে বিশাল রাজ প্রসাদ। যে পাহাড়ে থাকে রাজা ও রাণী। যে পাহাড়ের থরে থরে আছে পাহারারত সৈন্যদল। পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে এইসব বিষয় যখন ভাবছি আনমনে তখন কোথা থেকে যেন এক বৃদ্ধ লোক পেছন থেকে ডাক দিলো। ‘এই পোয়া, এন ঠিক দুইজ্জা দরহা মুরার নিচে কি গরর? তুর ঘর হোড়ে ? আমি হাল্কা চমকে গেলাম। কোন উত্তর দিলাম না কারন উত্তর জানা ছিল না। অতঃপর হতভম্ব চোখে মুখে বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে দৌড় দিলাম সেই পথে যেই পথ আমাকে পৌঁছে দিবে নদীর পাড়ের নৌকার মাঝির কাছে। দৌড়াতে দৌড়াতে বার বার পেছনে ফিরছিলাম। বার বার মনে হচ্ছিল- রাজা তাঁর সৈন্য সামন্ত নিয়ে আমাকে তাড়া করছে ধরার জন্য। মনে সাহস আনার জন্য মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকা শুরু করলাম। ঈশ্বর বন্দনা করতে গিয়ে মুখ থেকে বের হচ্ছিল-

 

থাকব না কো বদ্ধ ঘরে

দেখব এবার জগৎটাকে

কেমন করে ঘুরছে মানুষ যুগান্তরের ঘুর্ণিপাকে।

দেশ হতে দেশ দেশান্তরে

ছুটছে তারা কেমন করে,

কিসের নেশায় কেমন করে মরছে যে বীর লাখে লাখে,

কিসের আশায় করছে তারা বরণ মরণ-যন্ত্রণারে।।

 

কেমন করে বীর ডুবুরী সিন্ধু সেঁচে মুক্তা আনে

কেমন করে দুঃসাহসী চলছে উড়ে স্বরগ পানে।

জাপটে ধরে ঢেউয়ের ঝুঁটি

যুদ্ধ-জাহাজ চলছে ছুটি,

কেমন করে আঞ্ছে মানিক বোঝাই করে সিন্ধু-যানে,

কেমন জোরে টানলে সাগর উথলে ওঠে জোয়ার বানে।

 

কেমন করে মথলে পাথার লক্ষী ওঠেন পাতাল ফুঁড়ে,

কিসের অভিযানে মানুষ চলছে হিমালয় চুড়ে।

তুহিন মেরু পার হয়ে যায়

সন্ধানীরা কিসের আশায়;

হাউই চড়ে চায় যেতে কে চন্দ্রলোকের অচিন পুরেঃ

শুনবো আমি, ইঙ্গিত কোন ‘মঙ্গল’ হতে আসছে উড়ে।

 

কোন বেদনার টিকিট কেটে চন্ডু-খোর এ চীনের জাতি

এমন করে উদয়-বেলায় মরণ-খেলায় ওঠল মাতি।

আয়ার্ল্যান্ড আজ কেমন করে

স্বাধীন হতে চলছে ওরেঃ

তুরষ্ক ভাই কেমন করে কাঁটল শিকল রাতারাতি!

কেমন করে মাঝ গগনে নিবল গ্রীসের সূর্য-বাতি।।

 

রইব না কো বদ্ধ খাঁচায়, দেখব এ-সব ভুবন ঘুরে-

আকাশ বাতাস চন্দ্র-তারায় সাগর-জলে পাহাড়-চুঁড়ে।

আমার সীমার বাঁধন টুটে

দশ দিকেতে পড়ব লুটেঃ

পাতাল ফেড়ে নামব নীচে, ওঠব আবার আকাশ ফুঁড়েঃ

বিশ্ব-জগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।।

 

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

আপনি কি এই পোস্টটি দরকারী মনে করছেন?

সামাজিক মিডিয়াতে জানান!

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক লিটন বড়ুয়া

মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!