সোমবার , জুন ১৭ ২০১৯

মুফাসসিল ইসলামের পোস্টমর্টেম-৩

চতুর্থত আরেকটি বিষয় হতে পারে ষড়যন্ত্র। মৌচাকে ঢিল দিয়ে পালিয়ে গেলাম, এখন মৌমাছি যাকে পারে খুব কামড়াক। হয়তোবা ওদেরই একটা এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য এসেছিল, যেমন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে মিখাইল গরভাচেভ গ্লাসনস্ত ও পেরেস্ত্রইকার মাধ্যমে পুরো সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে ফেলেছিল। মুফাসসিল ইসলামও হয়ত এসেছিলেন, এক সময় সাথে করে এক গাদা নাস্তিকদের সাথে নিয়ে নিজ মতবাদের ভিতর ঢুকিয়ে দিবেন।

যদিও মুফাসসিল ইসলামের দাবি তার ভিডিও দেখে হাজার হাজার মানুষ নাস্তিক হয়েছে, আমি তার সাথে দ্বিমত পোষণ করছি। যাঁরা নাস্তিক হয়েছে বা হচ্ছে এঁরা মূলত তাঁদের ভিতরে জেগে উঠা প্রশ্ন ও কৌতুহলের উত্তর খুঁজতে গিয়ে, তার যুৎসই উত্তর না পেয়ে, অথবা উত্তরের সাথে নানান অসংগতি আবিষ্কার করে, আস্তে আস্তে নাস্তিক হয়েছে। এক্ষেত্রে মুফাসসিল ইসলাম শুধুমাত্র প্রভাবকের মত কাজ করেছে। এর বেশি কিছু না। আর হলেও তারা মুফাসসিল ইসলামের যুক্তিটুকুই গ্রহণ করে হয়েছে, ব্যক্তি মুফাসসিল ইসলামকে অনুসরণ করে নয়। ফরহাদ মাজহার, মেজর জলিল এরকম আরো অনেকেই উল্টোপথে ফিরে গেছে, কিন্তু তাঁদের অনুসারীরা যায় নি।

সর্বোপরি মুফাসসিল ইসলামকে যাঁরা চেনেন তাঁরা সবাই তাঁর একটি বিষয়ের সাথে একমত হবেন যে এই মানুষটির কথাবার্তার মধ্যে এক ধরণের অহমিকার বহিঃপ্রকাশ থাকত, তার দেহ ও অবয়বের ভাষার (body language) মধ্যে অন্যের প্রতি এক ধরনের তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের ভাব থাকত। তাঁর কথা বলার এই স্টাইলটি ছিল অনেকের কাছেই অসহ্য। এমনকি শেষ ভিডিওটাতেও কেবল আমিত্বের প্রকাশ। যে কোনো ব্যক্তি, যে কথায় কথায় কেবল আমি এই করেছি, সেই করেছি, আমি এই করতে পারি, ঐ করতে পারি ঝাড়ে, সে সকল মানুষ কখনোই কেন জানি আমি পছন্দ করি না। এরা খুব ভয়ংকর রকমের স্বার্থবাজ হয়। আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে এটা দেখেছি। মুফাসসিল ইসলামের আত্মম্ভরিতা এই মাত্রায় পৌঁছেছিল যে, এই লোকটি তার শেষ ভাষণেও বলেছেন, তিনি নাকি হয়ে উঠেছিলেন ‘নাস্তিক কিং’ হয়ে। এমন দাবি পৃথিবীর বিখ্যাত সব নিরীশ্বরবাদীরাও (ডকিন্স, রাসেল, হকিং, হুমায়ূন আজাদ, আহমেদ শরীফ, প্রবীর ঘোষ প্রমুখ) দাবি করে নি কখনো।

আসলে নাস্তিক কোনো হবার বিষয় নয়, নাস্তিকতা হলো ধারণ করার বিষয়। এবং এই ধারণ হতে হয় বোধের উৎসস্থলে এবং তা হতে হয় নিরন্তর। কিন্তু সবার সেই সক্ষমতা থাকে না। এখানে লাভের চাইতে ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি। একে পেট্রোনাইজ করারও কেউ নাই। যেহেতু এখানে ইনভেস্টমেন্টে কোন মুনাফা নাই (স্বর্গ/অপ্সরী/উর্বশী/ভোট/ক্ষমতা) তাই এখানে কেউ ইনভেস্ট করে না। এখানে যে আসে যুক্তির কষ্টিপাথরে বিশ্বাসের পক্ষের সকল যুক্তি খন্ডন করেই আসে। জেনেই আসে, এখানে পুলিশের হয়রানি আছে, জঙ্গির কোপানোর সম্ভাবনা আছে, প্রিয়জন হারানোর ভয় আছে, সামাজিক শ্লাঘা নিশ্চিত করা আছে। তারপরও মানুষ নাস্তিক হয়। এই নাস্তিক হওয়া ঠেকাতে রাষ্ট্রকে আইন প্রণয়ন করতে হয়, পাঠ্যপুস্তকে সিলেবাস তৈরি করতে হয়, মাঠে ঘাটে সভা সমাবেশ করতে হয়, তাকিয়া করতে হয়, ভয় দেখাতে হয়, লোভ দেখাতে হয়, আরো কত কি যে করতে হয় তার ইয়ত্তা নেই। তবুও এর স্রোত ঠেকানো যাচ্ছে না।

তবে এটাও একইসঙ্গে ঠিক যে বিভিন্ন লোভ লালসার টানে নাস্তিকতা থেকে কেউ বেড়িয়ে গেলেও তার আর আস্তিক হওয়া হয়ে উঠে না। এ তো আর কাফেরদের ধর্ম গ্রহণ নয় যে সে জানতই না কেন সে কাফের, আর কেন সে এখন ধর্মবাদী। এখানে তাই আস্তিকতায় মনোনিবেশ করতে চাইলে সৃষ্টি কর্তার অনস্তিত্বের পক্ষের যুক্তিগুলি এসে মস্তিষ্কে অনুরণন তুলে, গুঁতাবে। ফলে সে বড়জোর সংশয়বাদী হতে পারে (যদি থেকে থাকে?) আস্তিক নয় কোনভাবেই। সেই অর্থে সে যতই ধর্মের রিচুয়ালস পালন করুক না কেন কোন লাভ হবেনা। কারণ ন্যূনতম সন্দেহের অবকাশ থাকলে সে ধর্মীয় বিশ্বাসী (ঈমানদার) হতে পারবে না। একরকম ভণ্ডামি করেই তাকে জীবন কাটাতে হয়।

যাই হোক আমাদের ধর্মের প্রবর্তক হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর দূরদর্শিতা ছিল অসম্ভব রকমের প্রখর। তিনি নিজেই বলে গিয়েছেন, কিয়ামত যত এগিয়ে আসবে মানুষ ততই আল্লাহ্ সুবহানাতাআলা থেকে অনেক দুরে চলে যাবে। এভাবে এমন একদিন আসবে যে আল্লাহ্ সুবহানাতাআলার নাম নেওয়ার মত কেউ থাকবে না। অর্থাৎ সবাই নাস্তিক হয়ে যাবে। তখনই কিয়ামত সংগঠিত হবে। তাহলে এই আখেরী জমানায় এসে আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন, নাস্তিকদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকবে, প্রকৃত ধার্মিকদের সংখ্যা কমতেই থাকবে। আপনার এই চেষ্টা বৃথা চেষ্টা। আল্লাহ্ ও আল্লাহর রসূলের (দঃ) পরিকল্পনা, ইচ্ছা ও ভবিষ্যদ্বাণী এবং কিয়ামত বিরোধী। পরোক্ষভাবে বলতে গেলে এটি গোনাহর কাজ, বিদ্রোহের কাজও বটে।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার দারা চৌধুরী

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!