শুক্রবার , আগস্ট ২৩ ২০১৯

মুফাসসিল ইসলামের পোস্টমর্টেম-১

ইন্টারনেট জগতে মুফাসসিল ইসলামের আগমন ছিল মূলত অনেকটা ডঃ জাকির নায়েকের মত, ইসলামী আলোচনার মধ্য দিয়ে।

পঞ্চাশ ষাটের দশকে এদেশে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছিল। প্রায় সকল শিক্ষিত মানুষই সারাক্ষণ মার্কসবাদী ও লেনিনবাদী কথাবার্তা বলত। যে তেমন কিছুই জানেনা সেও দুচারটা কথা বলার চেষ্টা করত। বাম ঘরানার সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের তখন জয়জয়কার। মার্কসবাদ লেনিনবাদ নিয়ে কথা না বললে কেমন আনস্মার্ট লাগে। সবকিছুকেই মার্কসবাদের তত্ত্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করা তখন রীতিমতো ওয়াজিব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে বামপন্থী ব্যক্তিত্ব তখন সমাজের আইডল। ফ্যাশন হচ্ছে এমন একটি চর্চা যেটি বেশিরভাগ মানুষের কাছেই জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে কিন্তু যারা গ্রহণ করে তাদের একটা বড় অংশই জানে না কেন সে তা গ্রহণ করেছে। যেমন এই সময়ের একটা ফ্যাশন হচ্ছে হিজাব।

তেমনিভাবে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে এসে ধর্ম নিয়ে কথা বলাও একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। জ্ঞানী-মূর্খ, চোর-ছ্যাচ্চর, লম্পট-ঘুষখোর, সাধু- সরল, খুনী-ধর্ষণকারী সবাই এই আলোচনায় মত্ত ও আসক্ত হয়ে পড়েছে। একটি ধর্মীয় পোস্ট দিলে (এমনকি একটি ডাহা মিথ্যা কথাও ধর্মের নামে ছড়িয়ে দিলে) নিমেষেই লক্ষাধিক লাইক, কয়েক হাজার কমেন্টস পড়ে। যেন সবাই ধর্ম বুঝে গেছে, এক একজন ধর্মীয় পন্ডিত হয়ে উঠেছেন। অবশ্য ধর্মের ব্যাপারে দুচার কথা বলা কঠিন কিছু নয়ও। ছোটবেলা থেকেই সবাই এ বিষয়ে কমবয়সী শুনে আসছে, কানের কাছে এর ঘ্যানর ঘ্যানর সর্বদাই বাজছে। তদুপরি এটা কোন টেকনিক্যাল বা বৈজ্ঞানিক তত্ত্বও না যে খুব দুর্বোধ্য হবে। সাহিত্য বা সঙ্গীতও নয় যে ব্যখ্যা করতে অনেক প্রজ্ঞা বা রসবোধের দরকার হবে। ধর্মীয় শাস্ত্র অতীব সহজ এবং এর পরিধিও সামান্য। কিছু পারিবারিক নৈতিক কথাবার্তা, সৃষ্টিকর্তার বন্দনা ও প্রার্থনা, চাল চলনের কিছু নিয়ম কানুন (হাঁচি, ক্ষৌরকর্ম থেকে শৌচকর্ম) আর কিছু অলৌকিক গালগল্প। ফলে এই বিষয়ে কথা বলতে খুব বেশি পড়াশোনা করার দরকার হয়না, মেধা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চারও প্রয়োজন হয় না। যার কারণে আলোচনার জন্য সহজেই এটি হঠাৎ করে এদেশে একটি জনপ্রিয় বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে দেখবেন হাটে-মাঠে-ঘাটে, শহরে-গ্রামে, স্কুলে-কলেজে, শুড়িখানা, বেশ্যালয়ে সর্বত্র এখন ধর্মের আলোচনা, যাদের বেশিরভাগই মূর্খ।

মুফাসসিল ইসলাম (জাকির নায়েক, শমসের আলী, আরিফ আজাদ বা আহমেদ দিদাত সহ অনেকেই) সময়ের এই স্পিরিটটাকে ধরতে পেরেছিলেন এবং তা কাজে লাগিয়ে রাতারাতি নায়ক বনে গেছেন। যেহেতু এই আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বেশিরভাগ মানুষই অশিক্ষিত তাই অল্প লেখাপড়া জানা কিন্তু সামান্য কৌশলি বক্তা, নেহায়েত চাপাবাজ, কখনো কখনো স্রেফ ভাঁড়ও বনে গেছে নায়ক। ধর্মসভা গুলিতে এসব ভাঁড়দের দেখা আপনি প্রায়শই পাবেন, যাদের কথা শুনলে আপনি হয় হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবেন নয়তো বমি করবেন। টিভির জাকির নায়েকের মতোই মুফাসসিল ইসলামও ভিডিওতে ইসলামী বয়ান দিয়ে দিয়ে এমনই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন যে শেষ নবীর বিষয়টি স্থির না থাকলে এরাও বাঙালি মুসলমানদের কাছে অবতার হয়ে উঠত। এঁরা বাঙালী শিক্ষিত সমাজের কাছেও সমানভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন অন্য একটি কৌশল অবলম্বন করে। আর তা হলো ধর্মকে যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচেষ্টা করে ও বিজ্ঞান সম্মত প্রমাণ করার চেষ্টা করে।

শিক্ষিত, বিশেষ করে বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষেরা ধর্মচর্চা করতে যায় তখন তখনই কিছু কনফ্লিক্ট এর মুখোমুখি হয়। ধর্মের অনেক অবিজ্ঞান, অনৈতিক, অযৌক্তিক বিষয় গুলির কোনওরূপ ব্যাখ্যা দিতে না পেরে এঁদের অবস্থাটা ঐ শিশুর মতো হয়ে যায়, যাকে জিজ্ঞেস করা হলো, তুমি কাকে বেশি ভালোবাস, বাবাকে নাকি মাকে? অন্য কথায় বললে, অনেকটা প্রভুহীন কুকুরের মত। এঁরা না পারে বিজ্ঞানের ধ্রুব সত্যগুলি অস্বীকার করতে না পারে ধর্মের বিষয়গুলোকে ঝেড়ে ফেলতে। এ সময় ওঁদের নিকট ‘ডুবন্ত মানুষের নিকট খড়কুটোর ন্যায়’ আবির্ভূত হয় জাকির, মুফাসসিল, শমশের আলী, আহমেদ দীদাতের মত মানুষেরা। আর হয়ে উঠে দিকপাল।
(চলবে———-)

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার দারা চৌধুরী

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!