মিডিয়া ট্রায়াল, ভয়ংকর রায়ের আদালত

আমরা ভীষণ ব্যস্ত। এতটুকু সময় নেই যে চিন্তা-ভাবনা করে সত্য খবর সংগ্রহ করে পরিবেশন করার। ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে চোখে পড়ে যায় হরেক রকমের খবর। বিশ্বাস্য-অবিশ্বাস্য সবই পড়লে মনে হবে বিশ্বাস না করার কোন উপায় বাকি নেই। মানুষ দিন দিন যান্ত্রিক হয়ে পড়ছে, প্রযুক্তির উপর মানুষের এতো নির্ভরশীলতা বাড়ছে যা অভাবনীয়। আপনার চোখে পড়ার কথা, ফেসবুক পাতা স্ক্রল করতে গিয়ে প্রায় সময় দেখে থাকবেন র‌্যাব কিংবা পুলিশের মিডিয়া সেন্টারগুলোতে অনেকগুলো ইয়াবা কিংবা অস্ত্রের সামনে একজন মানুষের বুকে কাগজে প্রিন্ট করা একটি নাম, বয়স এবং আমি ইয়াবা ব্যবসায়ী কিংবা অস্ত্র কারবারী উপাধী দিয়ে হাতকড়া পড়ানো ছবি এবং হেডলাইন অমুক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইয়াবা নিয়ে গ্রেফতার, অস্ত্র নিয়ে গ্রেফতার ইত্যাদি হরেক রকমের খবরের হেডলাইন।


হেডলাইন পড়ে উদ্ধার হওয়া গেলে বাঁচা যেতো। হেডলাইনে ক্লিক করে খবর পড়তে ঢুকলে মনে হয় কোন আদালত দীর্ঘ সময় শেষে রায় দিচ্ছেন। প্রচারিত খবরের সাংবাদিক সমস্ত রকমের সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণ করে একটি রায় ঘোষণা করছেন এই মর্মে অমুক ইয়াবাসহ বা অস্ত্রসহ আটক হয়েছে, সে স্বীকার করেছে সে অনেক আগে থেকেই এইসব ব্যবসার সাথে জড়িত ব্লা ব্লা ব্লা। একজন ব্যক্তি আটক হওয়ার সাথে সাথে তাকে দোষী সাবস্ত করে রায় দিয়ে দেয় আমাদের তথাকথিত বেশিরভাগ মিডিয়া, যা সম্পূর্ণ আইনের পরীপন্থি। একটি সংবাদ মাধ্যমের দায়িত্ব কি? খবর প্রকাশের সিস্টেম কি হওয়া উচিৎ? কিভাবে নিরপেক্ষ সংবাদ প্রকাশ করতে হয় তা বেশিরভাগ সাংবাদিক জানেন বলে আমার কখনো মনে হয়নি।


ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী কোন অপরাধে আটক ব্যক্তি অভিযুক্ত মাত্র, অপরাধী নয়, যতক্ষণ না পর্যন্ত আদালতের রায়ের মাধ্যমে তার প্রতি আনীত অভিযোগ সন্দেহতীতভাবে প্রমাণিত না হয়। কিন্তু কেনো একজন ব্যক্তিকে আটক করার পর পর আইন শৃঙ্খলা বাহিনীগণ গলায় আমি অপরাধী সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয় এবং সাংবাদিকবৃন্দ স্বীকারোক্তিমূলক খবর প্রকাশ করে এবং তা কোন আইনের মাধ্যমে করায় তা আমার বোধগম্য নয়। এমনও অনেক নজির আছে, বেআইনিভাবে একজন ব্যক্তিকে আটক করার পর তার গলায় আমি অপরাধী মার্কা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হযেছে, আমাদের বেশিরভাগ মিডিয়াগুলোও তার নামে সংবাদ প্রকাশ করেছে আটক ব্যক্তি স্বীকার করেছে সে অপরাধ করেছে, সে দীর্ঘদিন ধরে এই অপরাধের সাথে জড়িত ছিলো ইত্যদি পাঠক রসমূলক কথাবার্তা দিয়ে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত রায় দিয়েছে সে নিরপরাধ একজন ব্যক্তি সুতরাং তাকে ফাঁসানো হয়েছে।


এখন মূল কথা হলো কারাগার থেকে নাহয় সে বের হলো কিন্তু আটক করার পর তাকে গলায় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে আমি অপরাধী স্বীকার করেছে বলে যে সাংবাদিকবৃন্দ খবর প্রকাশ করেছে এবং তার সামাজিক সম্মানের ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে তার দায় কে নিবে? দন্ডবিধির ৪৯৯ ধারার মানহানির অপরাধ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও সাংবাদিকবৃন্দ নিয়মিত করে থাকেন কিন্তু প্রতিকার না চাওয়ায় নিরীহ ব্যক্তিগুলো কোন প্রতিকার পান না। বেশিরভাগ সাংবাদিক এরকম ভিত্তিহীন প্রমাণ ব্যতিত একটি সংবাদ প্রকাশ করতে সেকেন্ড চিন্তাও করে না, একটি সংবাদ কারো সারাটি জীবনের অর্জন ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে।


আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর এমন সব আজগুবে কান্ড এবং সাংবাদিকদের মিডিয়া ট্রায়াল বন্ধে যথাযথ আইন প্রণয়ন জরুরী। খবুরে বিচারের কারণে অনেক সাধারণ মানুষ যেমন ভুক্তভোগী তেমনি উপায়বিহীন। দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব আজবে কান্ড বন্ধ নাহলে প্রথম সারির মিডিয়া এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়ে যাবে। মিডিয়া ট্রায়াল এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর এসব কান্ড নিয়ে অনেক বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি লেখালেখি করেছে বহুবার, কিন্তু কোন সমাধানে এখনো পোঁছানো যায়নি। এসব অদ্ভুত পাগলামো কান্ডের লাগাম টেনে ধরবে কারা?

লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শিপ্ত বড়ুয়া

শূন্য দশকের অপরাধ

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!