মা দিবসে বৃদ্ধাশ্রমের জননীরা

()

সন্তান কখনোই মা’র কাছে বোঝা হয় সে যদি একাধিক সন্তানও হয় কিন্তু একজন মা অনেক সন্তানের কাছেই বোঝা হয়। আজকাল অনেক মা’র খবর আমরা পত্রিকায় পরি যাদের ঠাঁই হয় অবহেলায় গোয়াল ঘরে বা রাস্তায়। মহামারীতে রোগে আক্রান্ত সন্তানকে একজন মা দূরে ঠেলে না দিলেও রোগে আক্রান্ত মাকে অনেকেই দূরে ঠেলে দেন। আজ বিশ^ মা দিবস। অথচ এই দিবসেও কত মা অনাদরে পরে আছে তার খোঁজ কে রাখছে। আজ অসহায় বৃদ্ধদের জন্য বহু বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছে। সেখানে কত মা’র ঠাঁই হয়েছে। সেখানে আজ সবাই অসহায়। কিন্তু বৃদ্ধাশ্রম হওয়া উচিত ছিল যার কোনো সন্তান নেই বা আশ্রয় দেবার কেউ নেই তার জন্য। বৃদ্ধাশ্রমে সন্তান আছে এমনকি সেই সন্তান হয়তো বড় কোনো চাকুরিজীবি তাদের মায়েদেরও আশ্রয় হয়েছে। একজন মায়ের অনকেগুলো সন্তান থাকলেও সবাইকে সমান ভালোবাসা দিয়ে বড় করে, তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু সেই অনেকগুলো সন্তানের কাছে একজন মা অনেক ক্ষেত্রে বোঝা হয়ে দাড়ায়। তখন দেখা যায় মা’র খাওয়া দাওয়া ভাগ হয়ে যায়, পোশাক দেয়ার দায়িত্ব ভাগ হয়ে যায়। তাকে একবেলা এই সন্তানের ঘরে তো আরেক বেলা অন্য সন্তানের ঘরে খেতে হয়। অথচ এই একমায়ের বুকের দুধ খেয়েই এসব সন্তান বড় হয়েছে। তাইতো বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে বহু বৃদ্ধা মহিলার দেখা মেলে যাদের সন্তান বড় বড় পদে আসীন। মা’র কাছে একাধিক সন্তান বহনের ক্ষমতা থাকলেও অনেক সন্তান মিলে একজন মা’কে বহন করতে হিমশিম খেয়ে যায়! পণ্যের মতো তাকে ভাগ করে নেয়। কোন সন্তান কতদিন মা’কে দেখবে, কে কতদিন খেতে দেবে এসব আরকি। মা’র জন্য একটু জায়গা তাদের নেই। মা বাবাকে দেখভাল করার জন্য আজ আইনের দরকার হয়। যদিও এই দাবি যুগোপযুগী এবং সময়ের সাথে প্রয়োজন হয়ে দেখা দিয়েছে। সন্তান দেখাশোনার জন্য বা বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য তো কোন আইন নেই। একদিন যখন সন্তানের সুখের জন্য নিজের আঁচল বিছিয়ে দিয়েছিল সেই সন্তানের দামী দামী আসবাবপত্রের ভিড়ে মা’র জন্য থাকার জায়গা কোথায়! মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে শুরু করে কথিত হাই সোসাইটিতে এসব চিত্র চোখে পরে। তাই মা’র ঋণ জন্ম জন্মান্তরেও শোধ করা যায় না।

প্রতিটি মায়ের শেষ বয়সটা যেন একটু নিরাপদে, সন্তানের সাথে পরিবারের ভেতর হাসি আনন্দে পার করতে পারে সে দায়িত্বটুকু আমাদের নিতেই হবে। নচিকেতার বৃদ্ধাশ্রম শিরোনামের গানে বলেছেন, ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার, মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার ওপার, নানান রকম জিনিস আর আসবাব নামী দামী, সবচেয়ে কম দামী ছিলাম একমাত্র আমি। কেবল একটি দিবস দিয়ে মা’র প্রতি ভালোবাসা দেখানো যায় না। কত মা প্রতিদিন রাস্তায় অনাহারে আধপেটায় রয়েছে তার খবর কে রাখছে। এই যদি হয় মায়েদের অবস্থা তাহলে বছরের একদিন মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে দিবস পালন করা উপহাস ছাড়া কিছু মনে হয় না। আমাকে তোমরা একটি শিক্ষিত মা দাও আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেবো। স¤্রাট নেপোলিয়নের এই উক্তি সবার জানা। মা আসলে কে? একজন মা তার সন্তানের জন্য একটি পৃথিবী। পৃথিবীর কোথাও আশ্রয় না মিললেও মা’র আঁচলতলে ঠিকই আশ্রয় মিলে যায় সন্তানের। সে সংখ্যায় যতজনই হোক। মা’কে আমার পরে না মনে/ শুধু কখন খেলতে গিয়ে/হঠাৎ অকারণে/একটা কী সুর গুনগুণিয়ে/কানে আমার বাজে/মায়ের কথা মিলায় যেন/আমার খেলার মাঝে- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মা’কে নিয়ে লেখা এই কবিতা পড়লে মা’র কথা মাকে হারানোর কথা মনে পরে। মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম বন্ধু। পৃথিবীর কোন সম্পদ,টাকা-পয়সা,গাড়ী,বাড়ি হারানোর সাথে মা’কে হারানোর তুলনা হয় না। মা নিয়ে যুগে যুগে রচিত হয়েছে অসংখ্য কবিতা,গান,গল্প,উপন্যাস,প্রবন্ধ। ম্যাক্সিম গোর্কির মা, শওকত ওসমানের জননীসহ কেবল মা’কে কেন্দ্র করেই কত সাহিত্য উঠে এসেছে। আরও বহু রচনা রচিত হবে নিশ্চিত। মোট কথা যতদিন এ বিশ^ তার অস্তিত্ত বজায় রাখবে ততদিন মাকে নিয়ে অনুভূতির কথা, বেদনার কথা নানাভাবে উঠে আসবে। পৃথিবীর সব সম্পর্ক, সব ভালোবাসা একটি সম্পর্কের কাছে এসে মাথা নোয়ায়। তা হলো মা আর সন্তানের সম্পর্ক। কোন ব্যাখ্যা নেই, কোন নাম নেই, কোন লাভ ক্ষতির হিসেব নেই, পাওয়া বা না পাওয়ার অতৃপ্তি নেই আছে কেবল পরিপূর্ণতা। এ এক নির্মোহ পবিত্র বন্ধন। যা কেবল মা আর সন্তানের মধ্যে হতে পারে।
মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ^ মা দিবস পালন করা হয়। মা’কে নিয়ে আলাদা একটি দিবসের প্রচলন হলেও বস্তুতপক্ষে কোন নির্দিষ্ট দিনে বা সময়ে বা উপলক্ষ করে মা’র প্রতি ভালোবাসা হিসেব করা যায় না। এটি সর্বকালের,সর্বসময়ের। মাতৃস্নেহের সকল গন্ডির উর্ধে। মা’র আঁচল ছায়ার প্রশান্তি পৃথিবীর সব শান্তি আর সুখের উপরে। ঠান্ডা এসির বাতাসও বুঝি মায়ের আঁচলের ছায়ার প্রশান্তি এনে দিতে পারবে না। কারণ এটি একদিনে প্রশান্তি অন্যদিকে নিরাপত্তার ছায়া। কোন সংজ্ঞায়,কোন মনীষির লেখায় মা’র তুলনা সম্পূর্ণ উপস্থাপন করা সম্ভব হবে না। তা কেবল খন্ডিতই থেকে যাবে। থেকে যাবে অপূর্ণতা। রচিত হবে কোন মা’কে নিয়ে অন্যরকম শ্রেষ্ঠ কীর্তি। তাই মাকে স্রষ্ট্রার পরেই স্থান দেয়া হয়েছে। সন্তানের সকল সুখ শান্তি এমনকি স্বর্গ মায়ের পায়ের নিচেই নিহিত। অথচ কেবল আধুনিকতার নামে, সামাজিক অবস্থানের কারণে বহু মা আজ সন্তানের কাছে অবহেলিত হয়ে যায়। যে বয়সে তার নির্ভরতা দরকার সেই বয়সেই সে হয় আশ্রয়হীন। যে সন্তানকে জন্ম দিয়ে শেষ নিঃশাস পর্যন্ত সন্তানের মুখ দেখে যেতে চান তাকে শেষ সময় কাটাতে হয় তারই মতো সন্তানের কাছে আশ্রয়হীন মানুষের সাথে। আজকাল এরকম বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে। ভবিষ্যতেও হয়তো বৃদ্ধি পাবে। কারণ আমরা যে আধুনিক হচ্ছি! আমাদের বিবেক ভোতা হচ্ছে বিপরীতে জাগছে স্বার্থপরতা। যেখানে সব সম্পর্কই মূল্যহীন।

লেখক: অলোক আচার্য, শিক্ষক,সাংবাদিক ।

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 4
    Shares

লেখক অতিথি লেখক

অতিথি লেখকদের ব্লগপোষ্ট এই একাউন্ট থেকে প্রকাশিত হবে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: এই ব্লগের লেখা কপি করা যাবে না