‘মা’ দিবসের গল্প ও ইতিহাস

()

আজকের ‘মা’ দিবসের দিনে মা-ছেলের একটা গল্প মনে পড়ে গেল।

তখন আমি ক্লাস ফোরে পড়ি। খুবি দুষ্ট আর লজ্জা প্রকৃতির ছিলাম। এখনো অনেকটা এমনই। আমার মা ছিলেন স্বাভাবিক গঠনের চেয়ে একটু খাটো। তখনকার সময়ে আমি মায়ের চেয়ে অবশ্য খাটো ছিলাম। বাবা ছিলেন অনেকটা অন্য প্রকৃতির। তিনি তার কাজ-কর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। তিনি আমাদের পড়াশোনার বিষয়ে এতো মাথা ঘামাতেন না। একবার স্কুলে অবিভাবক হিসেবে মা’কে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন পড়েছিল। তখন আমি মায়ের পরিচয়ে নিয়ে গেলাম আমার জেঠিমা’কে। তখন স্যার জিজ্ঞেস করলেন ওনি কি তোমার মা? আমি বললাম হ্যাঁ! তারপর মায়ের পরিচয়ে ওনি কিসব কাগজে সই-টই করে চলে আসলেন।

ঘরে আসতে না আসতেই দেখি খবরটি পৌঁছে গেছে মায়ের কান অবদি। মা খুব তাড়াহুড়ো করে স্কুলে গিয়ে স্যারের সাথে কথা বলে বাসায় ফিরলেন। বাসায় এসেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন – কেন এমনটা করলাম? আমিও বললাম এইসব আমি আপনাকে লজ্জায় নিয়ে না যাওয়ার জন্য করেছি। একথা শুনে মা একটুও রাগ করেননি। আমি বিস্মিত! মা হেসে বললেন – ঠিকাছে দেখি পরবর্তীতে তুই যখন ক্লাসের পর ক্লাসে উঠবি তখন কাকে নিয়ে যাস।

তারপর আরেকবার ক্লাস সিক্সে হাই স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় অভিভাবকের প্রয়োজন পড়েছিল। আমি বাসায় এসে মা’কে বললাম যে আপনাকে একবার স্কুলে গিয়ে আমাকে ভর্তি করাতে হবে। তখন মা হেসে বললেন তুর জেঠিমা’কে নিয়ে যা স্কুলে। আমি বললাম ‘না’। সেটা আর এখন সম্ভব না। এখন সত্যিকারের মা’কে নিয়ে যেতে হবে। মা বললেন ঠিকাছে যাবো। মায়ের মন বলে কথা।

ভর্তি হয়ে ফিরার সময় মা আমাকে বললেন – সন্তানদের জীবনে মা’কে বিষণভাবে প্রয়োজন। মা’কে ছাড়া সন্তান এক্কেবারে অসম্পূর্ণ, অস্পষ্ট।
সন্তানের মা’কে এতো বেশি প্রয়োজন যে তা তুমি উপলব্ধি করতে পারবে কখন জানো? যখন তুমি কোনো হোঁচট খেলেই বলে উঠবে ‘ওমাগো’ বলে।

আজ ১০শে মে ‘মা’ দিবস। মা’কে ভালোবাসতে কোনো দিনক্ষণ লাগে না। মা’কে ভালোবাসা যায় সবসময়। পৃথিবীর সকল মানবকুল আর প্রাণীকুলের সকল প্রজাতির মা’কে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। ভালো থাকুন আপনারা।

কীভাবে এলো ‘মা’ দিবস? এর পিছনের ইতিহাস কি?

মা দিবস বলে কিছুই নেই, প্রতিদিনই আমার কাছে মা দিবস তবে মায়ের প্রতি সমস্ত ভালোবাসা আর আবেগ প্রকাশের বিশেষ একটি দিন। আর এ বিশেষ দিনটির সূচনা করেছিলেন মার্কিন নাগরিক আনা জারভিস। মূলত মা দিবস পালনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিজের মা অ্যান জারভিসের স্বপ্নকেই পূরণ করেছিলেন জারভিস। ১৯০৮ সালের ১০মে নিজের শহর পশ্চিম ভার্জিনিয়া গ্রাফটন শহর আর ফিলাডেলফিয়াতে মা দিবস উদযাপন শুরু করেন জারভিস। গ্রাফটনে সশরীরে না গিয়ে একটি চার্চে ৫শ’টি কার্নেশন ফুল পাঠিয়েছিলেন তিনি। জারভিসের মায়ের পছন্দের ফুল ছিল কার্নেশন। আর তাই মা দিবসের প্রতীক হয়ে ওঠে কার্নেশন ফুল। ১৯১৪ সালে মা দিবসকে আনুষ্ঠানিক ছুটি ঘোষণা করেন উইড্রো উইলসন। আর মে দিবসের দ্বিতীয় রোববারকে বেছে নেয়া হয় দিবসটি পালনের জন্য।

আচমকা বাড়িতে গিয়ে মাকে চমকে দেয়া… কিংবা মাকে বড় করে কোন চিঠি লেখা… বেহিসেবী আর স্বতস্ফূর্ত আবেগ প্রকাশের মধ্য দিয়ে নির্দিষ্ট একটা দিনে বিশ্বজুড়ে মার প্রতি ভালোবাসার অভিপ্রকাশ ঘটাবে সন্তানেরা; এমনটাই ছিলো জারভিসের স্বপ্ন। তবে জারভিসের স্বপ্ন পর্যবসিত হয় স্বপ্ন-ভঙ্গে। বিকশিত বাজার-ব্যবস্থার অধীনে পণ্যায়িত হয় জারভিসের বিশুদ্ধ আবেগের ‘মা দিবস’।

যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে মা দিবসের প্রবর্তন সে মাহাত্ম্য ক্রমশ বিলীন হয়ে যেতে থাকে পণ্যায়নের কাছে। আর সবকিছুর মতোই ‘মা দিবস’এর আবেগজনিত দুর্বলতাকেই পণ্য বানিয়ে ছাড়ে মুনাফাপ্রবণ বাজার। আবেগের পরিমাপ নির্ধারিত হয় আর্থিক মূল্যে। হাতে লেখা চিঠির জায়গায় ঠাঁই করে নেয় শুভেচ্ছা কার্ড আর ফুলের তোড়া। মা দিবসে মায়েদের শুভেচ্ছা জানাতে ব্যবহৃত ঐতিহাসিক কার্নেশন ফুলেরও দাম বাড়িয়ে দেন ব্যবসায়ীরা। একসময় জারভিস টের পান মে’ মাস আসলেই কার্নেশন ফুলের দাম বেড়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেই নিজের উদ্যোগের প্রতি তিক্ত হয়ে ওঠেন জারভিস। এ যেন তার আরেক সংগ্রাম। মা দিবস চালু করতে যে অসমতল পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠলো এর বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধের সংগ্রাম।

মা দিবস শুরু হওয়ার ক’বছর পরই ১৯২০ সালের শুরুর দিকে মায়েদের জন্য ফুল আর অন্য উপহার সামগ্রী কেনা থেকে সন্তানদের বিরত থাকতে বললেন জারভিস। এমনকি এর জন্য বাণিজ্যিক চেতনাধারী নিজের সাবেক সমর্থকদেরও বিরোধিতা করতে কুন্ঠাবোধ করেননি তিনি। তিনি দেখলেন যে ফুল ব্যবসায়ীরা মা দিবস প্রবর্তনে তাকে সহায়তা করেছিল তাদের অনেকেই ঝুঁকে পড়েছে মুনাফার দিকে। ফুল ব্যবসায়ী, শুভেচ্ছা কার্ড উৎপাদনকারী এবং কনফেকশনারিকে দস্যু, দালাল, ছেলেধরাসহ বিভিন্ন নামে আখ্যায়িত করে জারভিস বলেন, নিজেদের লোভ মেটাতে একটি প্রেমময়, সৎ ও আদর্শিক উদ্যোগকে খর্ব করার চেষ্টা করছে মুনাফাভোগীরা।

মা দিবসকে ঘিরে ফুল ব্যবসায়ীদের বাজারমুখী প্রবণতা বন্ধ করতে নারী, স্কুল ও চার্চ গ্রুপগুলোর কাছে বিনামূল্যে ফুল পাঠালেন জারভিস। এমনকি ফুল ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা করার ও মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের প্রতীক কার্নেশন ফুলকে ট্রেডমার্ক করার আবেদন করবেন বলে হুমকি দেন তিনি। জবাবে উল্টো জারভিসকেই প্রলোভিত করে মুনাফার জগতে সামিল করার চেষ্টা চালায় ফুল ব্যবসায়ীরা। তাঁকে কমিশন দেয়ার কথা বলা হয়। আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন অ্যানা জারভিস।

কার্নেশন ফুল দিয়ে মা দিবস উদযাপনে ব্যবসায়ীদের প্রচেষ্টা বন্ধের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন জারভিস।
১৯৩৪ সালে ইউনাইটেড স্টেটস পোস্টাল সার্ভিস থেকে মা দিবসকে সম্মান জানিয়ে একটি স্টাম্প চালু করা হয়। স্টাম্পে রাখা হলো, শিল্পী জেমস হুইসলারের মাকে নিয়ে আঁকা হুইসলার’স মাদার নামের পেইন্টিংটি। আর স্টাম্পের কোণায় ছিল ফুলদানীতে রাখা কার্নেশন ফুল। স্টাম্পটি দেখে আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন জারভিস। তিনি বিশ্বাস করতেন স্টাম্পের কোণায় ফুলদানীতে রাখা কার্নেশন ফুলের নতুন সংস্করণটি মূলত ফুল ব্যবসা শিল্পের বিজ্ঞাপন ছাড়া কিছুই নয়।

মা দিবসে মায়েদের সহায়তার জন্য চ্যারিটি সংগঠনগুলোর উদ্যোগে তহবিল সংগ্রহেরও বিরোধিতা করেছিলেন জারভিস। এমনকি মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যুহার কমানোর নামে মা দিবসকে ব্যবহার করে টাকা তোলার বিরুদ্ধে সেসময়কার ফার্স্ট লেডি এলিয়ানোর রুজভেল্টকেও চিঠি দিয়েছিলেন তিনি। মা দিবসের বাজারীকরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলেন জারভিস। কার্নেশন ফুলের বিক্রি বন্ধের চেষ্টা করায় শান্তি বিনষ্টকারী হিসেবে উল্লেখ করে জারভিসকে একবার গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। আমেরিকান ওয়ার মাদার’স নামে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটির এক বৈঠকে চিৎকার চেঁচামেচি করায় তাকে টেনে হিঁচড়ে বের করে দেয়া হয়েছিল। একদিন একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরেরটি রুমে মা দিবসের বিশেষ সালাদ দেখে তা অর্ডার করেন জারভিস। তাকে সালাদ এনে দেয়ার পর দাঁড়িয়ে গিয়ে তা তুলে মেঝেতে ফেলে দেন তিনি। একইসঙ্গে সালাদের দাম পরিশোধ করে হন হন করে বেড়িয়ে যান তিনি।

বাজারমুখী প্রবণতার দিকে ঝুঁকে পড়ে যেসব সন্তানরা মাকে চিঠি না লিখে শুভেচ্ছা কার্ড কিংবা রেডিমেইড টেলিগ্রাম পাঠাতে লাগলেন, তাদের উদ্দেশ্য করে জারভিস বললেন, এভাবে শুভকামনা, কৃতজ্ঞতা কিংবা ভালোবাসা জানানোর মানে হলো পৃথিবীতে যে নারী তোমার জন্য সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন তাকে উদ্দেশ্য করে চিঠি লিখতে পর্যন্ত তোমরা আলস্য বোধ করছো। তিনি আরও বলেন, যেকোন অভিনব, গোছালো এবং কৃত্রিম শুভেচ্ছা কার্ডের চেয়ে সন্তানের লেখা অগোছালো একটি লাইনও মায়ের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 12
    Shares

লেখক অসীম বড়ুয়া

শিক্ষা নয় সুশিক্ষা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: এই ব্লগের লেখা কপি করা যাবে না