ভাষা আন্দোলনের পারমার্থিক পর্যালোচনা

ভাষা আন্দোলন ও পরমার্থ এই দুটো ব্যাপার ভালভাবে না বুঝলে আমরা শিরোনাম সংক্রান্ত বিষয়ে প্রবেশ করতে পারবনা৷ আমাদের ভালভাবে বুঝে নিতে হবে দুটি বিষয়, তারপর হতে পারে পর্যালোচনা। কিন্তু তার আগে ফয়সালা করা প্রয়োজন কেন পারমার্থিক পর্যালোচনা দরকার। আমরা তো পর্যালোচনার করার জন্য কত রকম পদ্ধতির নাম শুনেছি ; মার্ক্সীয় পদ্ধতি, উদারনৈতিক পদ্ধতি ইত্যাদি পদ্ধতি ব্যবহার করে আমরা পর্যালোচনা করে থাকি। তাই শেষ কালে আমি যখন আলাদা কথা বলব তখন আমার প্রতি আধুনিকতার বিরোধিতা কিংবা মার্ক্সবাদের বিরোধিতার আরোপ আসবে। আমার এই কথার মধ্যে শেষকালে খুঁজে পাওয়া যাবে সংশোধনবাদের ভিত্তি কিংবা ইতিহাসকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করার ষড়যন্ত্র । এসব বিষয়কে তাই আগেই পরিষ্কার করা ভাল।

আমাদের এই অঞ্চলের( বৃহৎ বঙ্গ থেকে বৃহৎ ভারতবর্ষ) আধ্যাত্মিকতা বা দর্শনচর্চা-ভাবচর্চা , প্রেম ও বিপ্লব তিনটি বিষয়কে একত্রে যদি এক কথায় বোঝাতে হয় তাহলে একটি শব্দই উচ্চারণ করতে হয় :পরমার্থ। “পরমার্থ ”এর মানে জানতে বেশি বেগ পেতে হবে না। বাঙলা শব্দকোষ খুঁজলেই জানা যায়, অভীষ্টতম বা শ্রেষ্ঠ বস্তু, পরম সত্য এবং ধর্ম, এই হচ্ছে পরমার্থের মানে। এখন বোঝার ব্যাপার হচ্ছে এই যে সত্য, ধর্ম ও শ্রেষ্ঠ বস্তু নামক তিনটি বিষয় আছে তাদের কিভাবে বুঝব বা কি আকারে বুঝব। কেননা এগুলো কি একেবারেই বিমূর্ত – গায়েবী ব্যাপার নাকি অন্যকিছু। আমাদের যদি এই অঞ্চলের ভাবচর্চা- দর্শনচর্চা এবং ভক্তি আন্দোলনের সাথে পরিচয় থাকে তাহলে খুব সহজেই বুঝে যাব ধর্ম বলতে আমরা বরাবরই রাজ আইন বা গায়েবী ফরমান বুঝিনা। ধর্ম হচ্ছে ধারণের বিষয় । এই জগতে ইন্দ্রিয়পরায়ণ সজীব সম্পর্ক বজায় রাখতে বা সপ্রাণ সত্তা আকারে বিরাজ করতে যা ধারণ করতে হয় তা ধর্ম। আর এই বিরাজ করা বা হাজির থাকার অন্যতম বড় শর্ত হচ্ছে অপরকে সাথে নিয়ে বিরাজ করা। সত্য বা পরম সত্যের ব্যাপারটাও আমরা ইউরোপীয় True এর মাধ্যমে বুঝতে পারবনা৷ কারণ সত্য বলতে বোঝায় যাপিত জীবনের ইন্দ্রিয়পরায়ণ সজীব সম্পর্কের মধ্যে বিরাজ করে তার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে যখন ইন্দ্রিয়পরায়ণতার সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে বৃহতের দিকে যাওয়া, তাকে নিজের মধ্যে বর্তমান বা হাজির করা। বস্তু কথাটাও আমরা Matter দ্বারা বুঝব না। কারণ বস্তু শব্দের ধাতু হচ্ছে √বস্ , যার অর্থ বাস করা, থাকা। তারমানে পরমার্থ বা অভীষ্ট বস্তু অন্যসকল বিদ্যমান কোনওকিছুর চেয়ে সেরা কোনওকিছু। শেষবিচারে তা ধর্ম ও সত্য। আরও সংক্ষেপ করতে চাইলে বলা যায় :সত্যই ধর্ম।কারণ শেষ পর্যন্ত সত্যই শ্রেষ্ঠ বস্তু, কেননা একে ধারণ করলেই সপ্রাণ সত্তা হিসেবে পরকে সাথে নিয়ে পরার্থপরায়ণ হিসেবে বিরাজ করা যায় এবং প্রতিমুহূর্তে যাপিত জীবনের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে বৃহতের দিকে যাওয়া যায় বা বৃহৎকে দেহে বর্তমান করা যায়। এই হচ্ছে পরমার্থের সারকথা।

পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজন নেই যে আধ্যাত্মিক, প্রেম ও বিপ্লবকে একত্রে পরমার্থ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। সেই আলোকে বা পারমার্থিক বিচারে এখন আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে। কারণ আমরা যদি সত্যিকার অর্থেই আমাদের ঐতিহাসিক কর্তব্য পালন করতে চাই তাহলে ইতিহাসকে আমাদের পদ্ধতির আলোকে বিচার করতে হবে। আর মনে রাখতে হবে পারমার্থিক বিচারের মূল কথাই হচ্ছে প্রতিটি বিষয় শেষ অবধি প্রতিটি বিষয় একে অপরের সাথে জুড়ে থাকে, আমরা যাকে বলতে পারি :বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য। (তথাকথিত আধুনিকতার সাথে এর তাত্ত্বিক পার্থক্য দেখা দিলেও আশাকরি মার্ক্স মহাশয় এই ব্যাপারে বিশেষ অমত করবেন না।) আর তার চেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে পারমার্থিক চিন্তাভাবনায় যা বিষয় তা আকার-নিরাকার যাই হোক তা মূর্ত, বিমূর্ত হলেও তা মূর্ত। অর্থাৎ জগতের সাথে তার সম্পর্ক বিচার সেখানে থাকতেই হবে তথা বাস্তব জীবনের সাথে তার যোগ থাকতেই হবে। এই ধরণের চিন্তাপদ্ধতি যে কতটা বিপ্লবী তা হয়ত এতক্ষণে আমরা বুঝে গেছি। এই বিপ্লবী পন্থায় যদি আমরা বিচার না করি তাহলে কিভাবে আমরা অগ্রসর হব, পালন করব আমাদের দায়িত্ব?

এবার ভাষা আন্দোলনের মূল জায়গায় আমাদের প্রবেশ করতে হবে বা পারমার্থিক বিচারে একে বুঝতে হবে। ভাষা আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সবার জানা।এই আন্দোলনের শ্রেণীচরিত্র, সেই শ্রেণীর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বিপ্লবী ভূমিকা এবং পরবর্তী কালে প্রতিবিপ্লবী ভূমিকা, যার ফলে বাংলা আজও পরিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রভাষা হয়ে ওঠেনি যেহেতু সর্বস্তরে চালু হয়নি , পক্ষান্তরে এই ভূখণ্ডের বাকি ভাষাগুলোও বিপন্ন ইত্যাদি। সেগুলো আমাদের মাথায় আছে। কিন্তু এতদিন আমরা ব্যাপারগুলো বিমূর্তভাবে বুঝেছি তাই কোনও সমাধানে আসতে পারিনি। আমরা তাই ভাষা আন্দোলন বলতে বিমূর্তভাবে ভাষার জন্য ও ভাষা শহীদদের জন্য হা হুতাশ,সারা ফেব্রুয়ারি জুড়ে ভাষা নিয়ে বড় বড় গালগল্প করা এবং ভাষার নামে বই বিক্রি করা বুঝি। আমাদের ভাব এমন আমাদের জীনের বাকিসব বিষয় থেকে ভাষা আলাদা কোনওকিছু, ভাষা আন্দোলন গায়েবী কোনও বস্তুর আন্দোলন! আমাদের বিমূর্তবাদী বা সোজা কথায় ভাববাদী জ্ঞানতত্ত্বের দরুণ আজ মানুষ দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে মারা যাওয়া, মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়ে আন্দোলন করা ভাষার থেকে, ভাষা আন্দোলন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা কিছু। আমাদের ভাব এমন ভাষা আন্দোলনের সাথে সোজা কথায় ভাষার নামে গালগল্প ও বই বিক্রির সময়ে বাকিসব দাবিদাওয়ার কথা বলা না জায়েজ কাজ। এই না জায়েজির ফরমান আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়ে আমাদের সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। যার কারণে আজ আমাদের অবচেতন বসে গেছে ফেব্রুয়ারী হচ্ছে ভাষার মাস! যেন এই মাস ছাড়া ভাষার আর কোনও অস্তিত্ব ছিলনা।

পারমার্থিক বিচারে ভাষা হচ্ছে আমাদের সপ্রাণ সত্তা হিসেবে বিরাজ করার অংশ। সপ্রাণ সত্তা হিসেবে বেঁচে থাকার শর্ত হিসেবে যখনই ভাষা হাজির হয়(এক্ষেত্রে যুক্ত করা ভাল ভাষা শর্ত হিসেবে হাজির হবার অর্থ হল প্রকৃতির অংশ হিসেবে হাজির হওয়া। এর ফলে ভাষা আর প্রকৃতি কাছাকাছি বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তখন ভাষা পরিণত হয় মায়ে। প্রকৃতি যে কারণে মা হয়ে যায়, ভাষাও তাই। মা, ভাষা আর প্রকৃতির মাঝে তখন হয়ে যায় সমতাকরণ) তখনই তা যুক্ত হয় সেই প্রাকৃতিক তথা জাগতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যার মাধ্যমে আমাদের ও জগতের দ্বান্দ্বিক সম্বন্ধ তৈরী হয়, যার ফয়সালা করতে আবার আবির্ভূত হন পরম। তাই ভাষা আন্দোলন বলতে বিমূর্ত কোনও আন্দোলনের অস্তিত্ব সম্ভব কিনা তা প্রশ্ন আসে। অন্তত যারা মার্ক্সবাদী- লেনিনবাদী চর্চার মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠেছেন তারা সহজেই বুঝবেন বিমূর্তভাবে ভাষা আন্দোলন বলতে কিছু হয়না, তা জীবনের যাপন প্রণালীরই অংশ।

তাই শেষ বিচারে বলা যায় ভাষা আন্দোলন কোনও বিচ্ছিন্ন তথা বিমূর্ত ঘটনা তথা ঘটনাপ্রবাহ নয়। জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় কর্মে, আন্দোলনে, দুর্ঘটনায়, আধ্যাত্মিকতায় এমনকি প্রেমচর্চায় ভাষা ও ভাষা আন্দোলন উপস্থিত ছিল আছে ও থাকবে। তাই আসুন আমরা সত্যকে স্বীকার করি ও সত্যপথে চলি!

লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 16
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    16
    Shares

ব্লগার আর্য সারথী

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!