বৌদ্ধ পণ্ডিত বিশ্ববিদ্যালয়

দশম শতকের প্রথমার্ধে চট্টগ্রাম পট্টিকারা (বর্তমান পটিয়া) চন্দ্রবংশের রাজাদের শাসনাধীন ছিল । এই চন্দ্র রাজবংশের সাথে আরাকানের চন্দ্ররাজ বংশের বৈবাহিক সম্পর্ক তথা জ্ঞাতি সম্পর্ক ছিল । পট্টিকারা চন্দ্র রাজবংশের শাসনকালে চট্টগ্রামে পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় । তিব্বত বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত শরচ্ছন্দ্র দাস (১৮৪১-১৯৯১ সাল) ও লামা তারানাথ তিব্বতি গ্রন্থ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা যায় । শুরুর দিকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মহাযান বা তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্ম বিষয়ক শিক্ষা প্রদান করা হতো । এর প্রধান অধক্ষ্য ছিলেন পটিয়া উপজেলার চক্রশালা নিবাসী সন্তান তিলপাদ বা প্রজ্ঞাভদ্র । মগধের প্রধান আচার্য নারোপা বা নারোতপা তার কাছে দীক্ষা গ্রহন করেন । খ্যাতনামা বৌদ্ধ পণ্ডিতগন এ বিশ্ববিদ্যলয়ে পরিদর্শক রূপে অথবা অধ্যাপক ছিলেন, তাদের মধ্যে ধর্মশ্রী, জ্ঞানপা, বুদ্ধপা, অনঙ্গবজ্র, সবরিপা, লুইসা, লাড়পা, অবধুতপা, অমোঘনাথ প্রমুখ । পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থান নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ পরিলক্ষিত হয় । পণ্ডিত শরচ্চন্দ্র দাস অনুমান করেন যে, চট্টগ্রাম শহরের আন্দরকিল্লাস্থ জামে মসজিদের নিকটস্থ পাহাড়ে এই পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় এর অবস্থান । আবার কারো কারো মতে, পটিয়ার চক্রশালায়, দেয়াঙ পাহাড়ে ঝিওরী, সীতাকুণ্ড চন্দ্রনাথ পাহাড়শীর্ষে, মীরশ্বরাই থানার পাগলপুরের ছুটিখা’র দীঘির সন্নিকটবর্তী এলাকায় এর অবস্থান ছিল বলে পণ্ডিতের ধারনা । পণ্ডিত শরচ্চন্দ্র দাস উক্ত লিপির তারিখ মগী সন ধরে (৯০৪ মগী+৬৩৮) (শোর, ২৯৯-৩০২) ১৫৪২ সালে স্থির করে চাণ্ডিলা রাজাকে আরাকান রাজ মিনবিন জৌবক শাহার (১৫৩১-১৫৫৩) অধিকৃত চট্টগ্রামের সামন্ত রাজা বলে চিহৃত করেছেন । ড.সুনীতিভূষণ সমর্থন করেন কিন্তু ড. আব্দুল করিম বলেন, তাদের সিদ্ধান্ত সঠিক নয়, কারণ রাজার নাম উল্লেখ ছাড়া কোন সামন্ত রাজার লিপি উৎকীর্ণ করার নিয়ম নেই । ড. সুনীতিভূষন বড়ুয়া তথ্য প্রমান দিয়ে বলেন পূর্নচন্দ্র (সামন্ত রাজা) ৭৮৮-৮২৮ খৃষ্টাব্দ ও সুবর্নচন্দ্র রাজা (সামন্ত রাজা) ৮২৮-৮৬৮খৃষ্টাব্দ বৌদ্ধ নথিপত্রে পাওয়া । দীপক বড়ুয়া সৃজন তাহার হাজার বছরের বাঙ্গালী বৌদ্ধ বইয়ে ও উল্লেখ করেছেন । ডা: রবীন্দ্র নাথ বড়ুয়া তাহার বইতে লিখেছেন সামন্ত বংশের অধিপতিরা এক সময় ধুংশাং জমিদারে পরিনত হয়, তিনি আরো উল্লেখ করে বলেন, তৎকালীন কলকাতা বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমিতি বা বেঙ্গল বুড্ডিষ্ট এসোসিয়েশনের আজীবন সাধারণ সম্পাদক কর্ত্তালা নিবাসী প্রয়াত ডা: শান্ত কুমার চৌধুরী’রা সামন্ত বংশের বংশধর । ১৯২৭ সালে চট্টগ্রাম আনোয়ারা উপজেলার দেয়াঙ পাহাড়ের কোলে এক গণ্ডগ্রাম ঝিওরী । প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারের ইতিহাসে সারা উপমহাদেশে এখন ও উজ্জ্বল হয়ে আছে । ঝিওরী গ্রামের সফরআলী বলীর ভিটে মাটি খোড়ার সময় ৬৬ টি পিতলে বৌদ্ধ মূর্তি আবিষ্কৃত হয় । তৎকালীন চট্টগ্রাম সরকারী কলেজের অধ্যাপক ধর্মবংশ মহাথের দীপংকর নামে এক ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে উক্ত বাড়ীতে যান কিন্তু সফর আলী বৌদ্ধ মূর্তি দিতে অস্বীকার করলে উক্ত আবিষ্কারটি পত্রিকায় প্রকাশ করে দেন । মনে করা হয় উক্ত গ্রামে পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বলে সকল প্রকারের জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটান । পরবর্তীকালে বিশ্ববিশ্রুত ড. বেনী মাধব বড়ুয়া ও উমেশ চন্দ্র মুৎসুদ্দী প্রমুখ পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়টি সম্পকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন । তারা মনে করেন, আন্দরকিল্লার রঙমহল পাহাড় এলাকার, যেখানে জেনারেল হাসপাতাল নির্মানকালে একটি বিরাট বৌদ্ধ মূর্তি সহ বেশকিছু ঐতিহাসিক নিদর্শন পাওয়া যায়।। আবার কারো কারো মতে পটিয়া চক্রশালায় পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়টি অবস্থান ছিল তবে ঝিওরী গ্রামটিতে এই বিশ্ববিদ্যলয়টির অবস্থান স্থল যে দেয়াঙ পাহাড় তার প্রমান অনেকাংশে নিশ্চিত করে দেয় । পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে বিলুপ্ত বা ধ্বংস হয়ে গেল তার সঠিক ইতিহাস জানা সম্ভব না হলে ও এটা সত্য চাটিগা দুর্গের নিকটেই ছিল দেয়াঙ কারাগার । যুদ্ধ চলাকালে এই কারাগারে দ্বার ভেঙ্গে হাজার হাজার কারামুক্ত বন্দী মোগলসৈনদের সাথে একাত্ম হয়ে পুরো দেয়াঙ শহরে আগুন লাগিয়ে ধ্বংসস্তুপে পরিনত করে ধারনা করা হয় যে দেয়াঙ শহরের হাজার হাজার বছরের স্থাপত্যসহ পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালটি ও ধ্বংস করে দেওয়া হয় এবং বার বার এই বিশ্ববিদ্যালয়টি আক্রান্ত হয়েছে । উল্লেখ আছে যে, এয়োদশ শতাব্দীতে তুর্কি আক্রমনের ফলে নালন্দা বিহার বিশ্ববিদ্যালয়টি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর পূর্ব দেশীয় বৌদ্ধ পণ্ডিত মণ্ডলীদের অনেকেই আশ্রয় নিয়েছিলেন এই পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে । দেয়াঙ পাহাড়ে পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার পূর্বে পরৈকোড়ার গ্রামে রয়েছে আকাশ ছোয়া একক প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার । স্থানীয়রা মগা বিহার বলে জানেন । প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় হয়তো এই বিহার থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টির সূত্র বেরিয়ে আসতে পারে । হয়ত বা এই বিহার হতে পারে পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের টার্নিং পয়েন্ট । মহাকালের বিবর্তনের ধারায় এই পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়টি হারিয়ে গেলে ও প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের মাধ্যমে যদি দেয়াঙ পাহাড়ে পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নিশ্চিত করা যায়, তবে শুধু বৌদ্ধ সভ্যতা নয়, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির আদি উৎস পর্যায়ের এক অজানা দিক উন্মোচিত হবে, ইতিহাসে সংযোজিত হবে এক অজানা অধ্যায় । স্মৃতি হিসেবে স্থাপিত হবে ঐতিহাসিক নির্দশন এবং আবারো পৃথিবীর ধর্মযাজক ও পর্যটকদের পা পড়বে দেয়াঙের প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতা ও পণ্ডিত বিহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ।
তথ্য সূত্র
চারুলতা
১৯৯৮ সাল
উত্তম কুমার বড়ুয়া
পৃ: ৭
বিশ্বমৈত্রী
২০১০ সাল
জামাল উদ্দিন
পৃ: ১৯ থেকে ২৭ পর্যন্ত
ডা: শান্ত কুমার জীবনী
১৯৮৫ সাল
ডা: রবীন্দ্র নাথ বড়ুয়া
পৃ: ১, ৭
হাজার বছরের বাঙ্গালী বৌদ্ধ
পৃ: ৮
দীপক বড়ুয়া সৃজন

শেয়ার করুন

ব্লগার জিতু চৌধূরী

মুক্ত চিন্তার মানুষ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।