বীর মুক্তিযোদ্ধা অরুণ নন্দী ; বাংলাদেশের সুপারহিরো

তখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। প্রতিদিন শত শত মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধে যোগ দিচ্ছেন মাতৃভূমিকে মুক্ত করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে।
সেই সময় কলকাতার মাটিতে শরণার্থী ছিলেন বাংলাদেশের এক সন্তান, নাম অরুণ নন্দী। নিজের জন্মভূমির এ দুঃসময়ে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন দেশের জন্য কিছু একটা করার, একেবারেই অন্যরকম কিছু। অন্ত্র হাতে নিয়ে শত্রুর বুকে গুলি চালানোর সামর্থ্য তার আছে। তবে তারচেয়েও বড় এক প্রতিভার অধিকারী তিনি, বিরতিহীন সাঁতরে যাবার অসাধারণ ক্ষমতা আছে তাঁর। চাঁদপুরের ছেলে হবার কারণে পদ্মা-মেঘনার মিলনস্থলে সাঁতার কেটেই বড় হয়েছেন তিনি।
মনে মনে পরিকল্পনা ঠিক করে দেখা করলেন এশিয়ানদের মাঝে প্রথম ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়া কিংবদন্তী সাঁতারু ব্রজেন দাসের সঙ্গে। অরুণের বুকের ভেতর জ্বলতে থাকা আগুনটা টের পেলেন বিক্রমপুরের ছেলে ব্রজেন। তার তত্ত্বাধানেই বৌবাজার জিমনেসিয়ামে কঠোর ট্রেনিংয়ে নামলেন অরুণ।

দূরপাল্লার সাঁতারু হলেও সেরকম কোনো ইভেন্ট সেই সময় অরুণের হাতে ছিল না। এবং থাকলেও তাতে অংশগ্রহন করা তাঁর জন্য সহজ হতো না। তাছাড়া ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিতে হলে চাই অনেক সময় এবং প্রচুর অনুশীলন। তাই অরুণ ঠিক করলেন সাধ্যের মধ্যে থাকা পরীক্ষাটায় উৎরে যাবার – অর্থাৎ একটানা সাঁতার। এ ধরণের সাঁতারে তখন বিশ্বরেকর্ড ছিলো বি.সি. মোরের। ৮৮ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট একটানা সাঁতরে এই বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন মার্কিন সাঁতারু মোর। অরুন নন্দী সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁর রেকর্ডটা ভেঙে
দেয়ার।

সেদিন ছিলো ১৯৭১ সালের ৮ই অক্টোবর। সকাল সাড়ে আটটায় কলকাতা কলেজ স্কয়ারের পুকুরে নামলেন অরুণ। কলকাতার চাঁদপুর সম্মিলনী এবং বৌবাজার ব্যায়াম সমিতির যৌথ এই আয়োজনের উদ্বোধন করলেন কলকাতায় বাংলাদেশের হাই কমিশনার হোসেন আলী। ম্যানেজার হিসেবে ছিলেন ব্রজেন দাস। কোন দূর্ঘটনা ঘটলে অরুনকে উদ্ধারের জন্য প্রস্তুত ছিলেন ভারতের তিন বিখ্যাত সাতারু পরেশ দত্ত, পি কে সরকার এবং দিলীপ দে। আটটা পয়ত্রিশ মিনিটে সাঁতার শুরু করলেন অরুণ, সাঁতরে চললেন
বিরামহীন – সুর্যোদয় এবং সুর্যাস্তের মাঝে গভীর
সুনসান রাতে জলাশ্রয়ী এক মুক্তিযোদ্ধা।

১২ই অক্টোবর রাত ২টা ৪০ মিনিটে থামলেন অরুণ। ক্লান্ত বিধ্বস্ত শরীরটা পানি থেকে তুলে মাটিতে এলিয়ে দেওয়ার আগে জোরে স্লোগান দিলেন – “জয় বাংলা!” স্টপওয়াচে তখন দেখাচ্ছে ৯০ ঘন্টা ৫ মিনিট টানা সাঁতার কেটেছেন অরুণ। বি.সি. মোরের বিশ্বরেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন আরও ঘণ্টাখানেক আগে। ছুটে এলেন যুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ এবং মন্ত্রী কামরুজ্জামান। সেই বিশ্বরেকর্ডের সাক্ষী ছিলেন কিংবদন্তী নায়ক উত্তম কুমার এবং অস্কারবিজয়ী চিত্রনির্মাতা এবং ঔপন্যাসিক সত্যজিৎ রায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার দেড়মাস পূর্বেই গিনেস বুক অফ রেকর্ডসে নিজের নাম উঠিয়ে রাখলেন অরুণ। এই অসামান্য কীর্তির জন্য এক লক্ষ রুপী পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল অরুণকে। পুরো টাকাটাই তিনি দান করেছিলেন বাংলাদেশ তহবিলে, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। তৎকালীন সময়ে এই অর্থের মূল্য ছিলো অনেক।
অরুণ নন্দী ১৯৪১ সালের ২৬শে নভেম্বর চাঁদপুরের বাগদী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আর মৃত্যুবরণ করেন ২০০৮ সালের ১৬ই নভেম্বর – কলকাতায় নিজের বোনের বাসায়।

স্যালুট তোমাকে, মি. নন্দী!

শেয়ার করুন

ব্লগার দিয়ার্ষি আরাগ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।