সোমবার , আগস্ট ২৬ ২০১৯
আমাদের স্কুল আনন্দের এক রঙিন ফুল

ফোন হাতে বাবু স্যার

অষ্টমের পাঠ চুকিয়ে আমরা সবেমাত্র নবম শ্রেণিতে উঠেছি। নবম শ্রেণিতে উঠতেই আমাদের মেধাবী বন্ধুরা চলে গেল বিজ্ঞান শাখায়। আমদের মতো টেনেটুনে পাশ করাদের স্থান হলো বানিজ্যিক শাখায়। কে কোন বিভাগে যাবে এটা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মতামতের খুব একটা গুরুত্ব ছিল বলে মনে পড়ে না।

তবে স্কুলের সব কড়া শিক্ষকের ক্লাস পড়ল বানিজ্যিক শাখায়। হেডস্যার বলে দিয়েছেন এইবারের বানিজ্যিক শাখার ব্যাচটা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। তাছাড়া আজকাল বাবা মা সন্তানদের খোঁজ রাখেন না। ছেলেদের গোঁফ গজানোর আগে মোবাইল কিনে দিচ্ছে।

আমাদের হেডস্যারের নাম হারুনুর রশিদ। সবাই রশিদ স্যার নামে চিনে। চুলবিহীন মাথা আর অগ্নিমূর্তি চোহারা। ছাত্র-ছাত্রীরা তো দূরের কথা অনেক শিক্ষকেরও তার সামনে গিয়ে কথা বলতে পা কাঁপে।
টিফিন ছুটি শেষে ঘন্টা বাজার পরও যখন ছাত্রছাত্রীরা মাঠে খেলত তখন হেডস্যার একটা বেত হাতে স্কুলের উত্তর পাশের বারান্দা থেকে দক্ষিণ পাশের বারান্দা একবার হেঁটে যেত। মূহুর্তেই সব ছাত্র-ছাত্রীরা ক্লাসে ঢুকে যেত।
হেডস্যারের যতসব কড়া কড়া নিয়ম। কোন স্যার ক্লাসে দেরি করে গেলে অথবা সিলেবাস শেষ করতে না পারলে তার বেতন কেটে রাখা হতো। তার এত কড়া কড়া নিয়মের জন্য তরুণ শিক্ষকরা তাকে খুব ভয় পেত। হেডস্যারও সবাইকে ধমকের উপর রাখতেন।  স্কুলে হেডস্যারের একজন প্রিয় ও আস্থাভাজন স্যার আছেন। তার নাম নারায়ণ স্যার। পুরা নাম নারায়ণ চন্দ্র দাশ। হেডস্যার ডাকতেন চন্দ্রবাবু। আমরা কাগজে কলতে নারায়ণ স্যার লিখলেও বাবা মায়ের রাখা নাম বাদ দিয়ে আমরা ডাকা শুরু করছিলাম বাবু স্যার। তবে কালক্রমে আমরা যে তার আর কত নাম দিয়েছি তা কোনদিন বাবু স্যার জানলে অভিশাপে আমাদের  আর স্বর্গে যাওয়া হবে না।
হেডস্যার ও বাবু স্যার  প্রতিবছর মেট্রিকের রেজাল্ট উত্তরত্তোর ভাল করার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করতেন। হেডস্যার দায়িত্ব নেওয়ার পর আমাদের স্কুল প্রতিবছর মেট্রিকের রেজাল্টে উপজেলায় প্রথম হয়ে আসছে। কিন্তু গতবছর আশানুরূপ রেজাল্ট হয়নি।

তাই এইবছর মেট্রিক পরীক্ষার সময় হেডস্যার আর বাবু স্যার দুইজনেই সন্ধ্যার পর সাইকেল নিয়ে পাড়ায়  ঘুরে ঘুরে পরীক্ষার্থীদের খোঁজখরব নিতে লাগলেন। ছেলেমেয়ের পড়ালেখার প্রতি যত্নশীল হতে অভিভাবকদের পরামর্শ দেন। এই অজ পাড়াগাঁয়ে রাতে শিক্ষার প্রদীপ জ্বালাতে দুই শিক্ষাগুরু এই বাড়ি থেকে ঐ বাড়ি ঘুরে বেড়ান।
একদিন সন্ধ্যার পর এক পরীক্ষার্থীর বাড়িতে গিয়ে স্যারেরা ছাত্রকে বাড়িতে পাননি। বাবা- মাও জানেন না ছেলে কোথায় গেছে। এই অবস্থা দেখে বাবু স্যার অভিভাবকের উপর বেজায় ক্ষেপেছিলেন।
সন্ধ্যার পর খোয়ারে মুরগী ঢুকছে কিনা খবর নিতে পারেন কিন্তু মেট্রিক পরীক্ষার্থী ছেলেটা পড়তে বসেছে কিনা খবর নেননা। আর ফেল করলেই স্কুলের দোষ!’
বাবু স্যার আন্তরিক কিন্তু বদমেজাজি। স্কুলে হেডস্যারের পরে ছাত্র-ছাত্রীরা বাবু স্যারকেই ভয় পায়। প্রচলিত আছে তিনি কাউকে ধরলে তাকে পানি করে ছাড়েন। কেউ যদি তার নজরে পড়ে  তার রক্ষা নেই। আমরা বলি টার্গেটে পড়া। বাবু স্যারের টার্গেটে পড়লে তার আর পান থেকে চুন খসানোরও সুযোগ নাই।
স্কুলের মিটিংয়ে আমাদের নবম শ্রেণি বানিজ্যিক শাখার শ্রেণি শিক্ষক করা হয়েছে বাবু স্যারকে। হেডস্যারের দৃষ্টিতে এই কঠিন  ব্যাচটাকে শায়েস্তা করতে পারবেন একমাত্র বাবু স্যার। ফলে আমাদের ব্যাচের ছাত্র-ছাত্রীদের সমস্ত ভালমন্দ,উপবৃত্তি,পাশ- ফেল,ছুটি,সুপারিশ এখন থেকে সবকিছুর দায়িত্ব বাবু স্যারের।
শুধু তাই নয় তিনি আমাদেরকে প্রথম ক্লাসে ইংরেজি প্রথম পত্র ও পঞ্চম ক্লাসে ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পড়াবেন। আবার যারা প্রথম ক্লাসে পড়া শিখে আসত না তাদেরকে টিফিন ছুটিতে সেই পড়া মুখস্থ করতে হতো। বাবু স্যার পঞ্চম ক্লাসে এসে সে পড়া কড়ায়-গন্ডায় উসুল করতেন।।

বাবু স্যার বলে দিয়েছেন যারা ক্লাসে ড্রেস না পরে আসবে তাদের পুরা ক্লাস কান ধরে বেঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। নবমে উঠে সদ্য বড় হয়ে উঠার উদ্দীপনায় চুলে নতুন কাট দেওয়া ছেলেরা  এতসব কড়াকড়িতে টুপি পড়া শুরু করেছে।

আমাদের ক্লাসে একটা গ্র্রুপ রঙিন পোশাকে ক্লাসে আসত। নবমে উঠার পরও স্কুলের কয়েকটি নিয়ম ভঙ্গ না করলে আসলে বড় হয়ে উঠা হয়না।নানা ধরনের রঙিন পোশাকে তারা মনের মধ্যে থাকা কৈশোরের উন্মাদনা শরীরে ফুটিয়ে তুলত। তবে তাদের সবার ব্যাগে থাকত একটি স্কুল ড্রেস। ক্লাসের পেছনে গিয়ে বাবু স্যারের ক্লাসের আগে রঙিন পোশাক পাল্টিয়ে স্কুল ড্রেসের সাদা শার্টটা পরে নিত।

একসময় বাবু স্যারের গাদা গাদা পড়ার ভয়ে বেশীরভাগ ছাত্ররাও চতুর্থ ঘন্টার পর টিফিন ছুটিতে স্কুল পালাত। স্কুল পালানোর জন্য নানা জনের নানা ফন্দি ফিকির  ছিল।কিন্তু কোন ফন্দি ফিকিরেই শ্রেণি শিক্ষক বাবু স্যারের মন গলত না। ফলে ছাত্ররা নতুন নতুন বুদ্ধি বের করল।
নতুন ভবনের পেছনে যে সীমানা প্রাচীরের নিচে শেয়াল গর্ত করে আসা যাওয়ার পথ করেছে। উত্তর-পূর্ব পাশের যে বাথরুম তার ছাদের সাথে লাগোয়া মেহগনি গাছের ডাল। এই গাছের গোড়া সীমানা প্রাচীরের বাইরে।
এই দুইপথে যারা পালাতে ব্যর্থ হতো তাদের গুনতে হতো পাঁচ টাকা।
মূল ফটক দিয়ে পালাতে দারোয়ানের হাতে গুজে দিতে হতো পাঁচ টাকার নোট।  পাঁচ টাকা গচ্ছা যাওয়া বাবু স্যারের অগণিত বেতের বাড়ি আর মেয়েদের সামনে কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে ঢের ভাল ছিল বন্ধুদের কাছে।
আমরা পাঁচ বন্ধু পঞ্চপান্ডব নামে পরিচিত ছিলাম। আমি,নিলয়,জনি,শুভ আর কামরান। বন্ধুদের মধ্যে জনি ছিল বেশী চটপটে আর সাহসী। ঘাড়ত্যাড়াও বলা চলে। সৌভাগ্যক্রমে আমাদের পাঁচজনের স্থানই হয়েছিল বানিজ্যিক শাখায়। সব পড়া পারা বন্ধুদের বিজ্ঞান শাখায় নিয়ে যাওয়ার পর আমরা যারা ইনিয়ে বিনিয়ে পড়া পারতাম তারা স্যারদের নজরে পড়ি। শিক্ষকদের নজরে পড়ার পর সামনের বেঞ্চের একটি সিট আমার জন্য নির্ধারিত ছিল। আর আমার চার বন্ধু বসত ক্লাসের সর্ববামের সর্বশেষ বেঞ্চে।
প্রায় টিফিন ছুটির পর এই বেঞ্চ খালি থাকত। সকালে মোট উপস্থিতি কত তা ব্লাক বোর্ডে লিখে যেতেন বাবু স্যার। কিন্তু পঞ্চম ক্লাসে সে সংখ্যা অর্ধেকে পৌঁছত।
স্কুল ড্রেস,প্রথম ক্লাসে না পড়ে আসা পড়া পঞ্চম ক্লাসে দেওয়ার নিয়ম, ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের  মুখস্থ পড়া দেওয়ার ভয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুল পালাত।

বাবু স্যার পঞ্চম ক্লাসে আসার সময় হাজিরা খাতা নিয়ে আসতেন। তিনি ফের রোল কল করতেন। যারা সকালে উপস্থিত ছিল কিন্তু পঞ্চম ক্লাসে থাকত তাদের নাম হাজিরা খাতায় লাল কলম দিয়ে গোল করে দিতেন।
স্কুল পলাতকদের  একটি তালিকা করেছেন। রেডলিস্ট নামক  স্কুল পালানোদের এই তালিকা তিনি হেডস্যারকে দিয়েছেন। হেডস্যার রেডলিস্ট হাতে পেয়ে অভিভাবকদের ডেকে পাঠালেন।
আমাদের মধ্যে কয়েকজনের কাছে জেনে নিলেন কোন কোন পথে বন্ধুরা স্কুল পালায়। এই খবর পৌঁছে দেওয়া বন্ধুদের স্কুল পালানোরা টিকিটিকি নাম দিয়েছিল।

সব জেনে হেডস্যার দারোয়ানকে কাজে গাফিলতির জন্য চাকরিচ্যুতি করবেন বলেও শাসালেন। মেহগনি গাছ কাটালেন,শেয়ালের গর্তও বন্ধ করালেন।

এরপর অভিভাবকদের চাপে আর রেড টিসির ভয়ে আমার বন্ধুরাও টিফিন ছুটিতে স্কুল পালানো কয়েকদিনের জন্য বন্ধ করল। এদের মধ্যে একজন আছে যাকে কোন ঝড়-ঝ্বন্ডা জ্বলোচ্ছ্বাস দমিয়ে রাখতে পারেনা। সে হলো জনি।
সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। ঝুমঝুম বৃষ্টি। সবাই কোনরকমে ক্যান্টিনে টিফিন করে ক্লাসে বসে আছে। মাঠে খেলতেও পারেনি কেউ। আমরা পড়া বাদ দিয়ে বৃষ্টির পানিতে হিজল ফুল ভাসতে ভাসতে দূরে চলে যায় দেখছিলাম।

আর জনি ভাবতেছিল এতকিছুর পরও কীভাবে পালানো যায়।
স্কুলের দারোয়ান এখন খুব কড়া। ১০ টাকা দিলেও কাজ হয়না। আবার এইদিকে বাবু স্যার আজকে সবাইকে পাঁচটি সিন ক্লজ পাঁচটি আনসিন ক্লজ পড়ে আসতে বলেছেন। জনি ইংরেজি বই ই তো কিনেনি।
এরইমধ্যে সে নিজের বই চারভাগ করে আমাকে শুভকে নিলয় আর কামরানকে দিয়ে দিছে। এরপর বৃষ্টি মাথায় ভিজতে ভিজতে স্কুল মাঠের উত্তর পাশ হয়ে জনি হারিয়ে যায়।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখি বাবু স্যারের সাইকেলের পেছনে করে স্কুলে ঢুকছে জনি। দুইজনের মাথায় দুইটি পলিথিন। কাহিনী আমাদের বুঝা শেষ। আবার পালাতে গিয়ে বাবু স্যারের কাছে ধরা পড়েছে ।
জনি মুখে শুনেছিলাম একদম পেছনের দেওয়াল টপকিয়ে বিলের মাঝ দিয়ে রাস্তায় উঠতেই বাবু স্যারের মুখে পড়েছিল সে। সাথে সাথেই সাইকেলের পেছনে বেধে নিয়ে আসে তাকে। না মারধর করেনি। যা হওয়ার ক্লাসে হবে।
জনি ক্লাসে ঢুকার কিছুক্ষণ পর বাবু স্যার ক্লাসে ঢুকেছে। গায়ের জামা ভেজা। ভেজা চুল মুছছে তবু আদ্র ভেজা। নোয়াখালির মানুষ তার উপর রগচড়া।  জনি যা করল আজ আমাদের সবার কপালে আজ খারাপি আছে। জনির রাগ আমাদের সবার উপর যায় কিনা আমরা সেই ভয়ে আছি।
ক্লাসে ঢুকেই বেত হাতে ক্লাসটা বেশ কয়েকবার ঘুরান দিলেন। ইশারায় জনিকে সামনে ডাকল। না আজ ফের নাম ডাকার বিকার লক্ষ্য করলাম না।
এরপর প্রথম বেঞ্চে বসেও জনির সাথে কথোপকথন হলো তার সবটা আমি শুনতে পেলাম না। তবে কানে ধরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার নির্দেশ ক্লাসের সবাই শুনতে পেল।
এক পায়ে তালগাছ দাঁড় করানো রেখেই স্যার দিনের পড়া শুরু করলেন। পাঁচটি সিন ক্লজ পাঁচটি আনসিন ক্লজ।
পড়ার জিজ্ঞেস করার আগে কে কে বই আনে নাই তাদের শাস্তি প্রারম্ভে দিয়ে দেন বাবু স্যার। এই মামলারও আসামী হওয়ায় তালগাছ শাস্তি রহিত হয়েছে জনির। পড়ার জিজ্ঞেস করার এক ফাঁকেই জনিকে আপাতত বেঞ্চে যেতে বললেন স্যার।
ক্লাসে এতগুলো ছেলেমেয়ে বই না আনার জন্য স্যার বেশকিছুক্ষণ ছাত্রদের অভিভাবকদের অসচেতনা আর আমাদের অন্ধকার ভবিষ্যতের আশঙ্কার বয়ান দিলেন।
এরপর তিনি যারা পড়া শিখে এসেছে তাদের হাত তুলতে বললেন। এই সংখ্যা পাঁচ অতিক্রম না করায় তিনি বাকিদের কান ধরে বেঞ্চের উপর দাাঁড়ানোর ফরমান জারি করলেন।আমাকে বললেন অফিস থেকে অতিরিক্ত দুইটি বেত নিয়ে আসতে ।
প্রতিদিনের রাগের চেয়ে বাবু স্যারের আজকের রাগ ঢের বেশী মনে হলো।
হয়ত আমাদের সবার চেয়ে পেছনের বেঞ্চে বসা জনির চিন্তা আরও বেশী ছিল।
বেত আসার পর বাবু স্যার প্রথম বেঞ্চ থেকেই মাইর শুরু করেন। যারা পড়া শেখেনি তারা দশ বেত আর সাথে যারা বই আনেনি তারা ১৫ বেত।
‘অপারেশন ১০-১৫ বে ’ চলাকালেই স্যারের ফোনে বারবার কল আসতেছিল। স্যার সদ্য একটি নোকিয়া ১১০০ মডেলের ফোন নিয়েছেন। সাথে গ্রামীণ সিম। এক মিনিট ফোনে কথা বললেই সাত টাকা। স্যারের সদ্যকেনা ফোনটি স্যার ফোন কভারের পাশাপাশি বিশেষ একটি পলিথিন দিয়ে মুডে রেখেছেন। বৃষ্টি কেন দেশে বন্যা হলেও তাঁর ফোনে পানি ঢুকার কোন সম্ভাবনা নেই।
বারবার কল আসায় সমস্ত নিরাপত্তা বেষ্টনি ভেদ করে বাবু স্যার ফোন বের করছিলেন। কিন্তু ফোন বের করে যখন ই রিসিভ করতে যাবেন তখনই কল মিসড হয়ে যাচ্ছে।
একটি কল মিসড হয়ে গেলে তিনি ফোন ঢুকিয়ে ফের মাইর শুরু করেন। এক/দুইজনকে মারতে না মারতে আবার কল। আবার সেই একই কাহিনী পলিথিন ভেদ করে ফোন করে রিসিভ করতে না করতেই কল মিসড। এইভাবেই দুই তিনবার হলো।
স্যার পড়ে গেলেন মহা মুশকিলে।  সাতটাকার মায়া ত্যাগ করে এইবার তিনি ফোন ব্যাক করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এদিকে পঞ্চম ক্লাসের ঘন্টা বেজে যেতে বেশী সময় বাকি নেই। এভাবে বারবার মিসড কলে ফোন বের করতে গেলে সবাইকে মারার সময় তিনি পাবেন না।
কিন্তু যে তিনি ফোন ব্যাক করতে গেলেন সাথে সাথে পিছনে ফোন জনির ফোন বেজে উঠল। আমরা কেউ এটা খেয়াল না করলেও হারুন স্যার ঠিকই ধরে ফেলেছেন। তিনি এক নিশ্বাসে জনির বেঞ্চে পৌঁছেছেন।
‘হারামজাদা আমার লগে বিটলামি !
তোরে জীবন আজ শেষ। স্যারের ফোনে মিসড কল !
আমার লগে শেয়ানায় করোস !
সামনে আয় !’
ঘটনার আকস্মিকতায় ক্লাসের সকলে বিস্মিত। জনিই বাবু স্যারকে মিসড কল দিচ্ছিল !
বাবু স্যার রাগে কথা বলতে পারছেন না। ‘হারামজাদা তোকে আজ মেরেই ফেলব।’
টেবিলের নিচে মাথা ঢুকিয়ে জনির উপর দুইটা বেত শেষ হয়েছে। স্যার দুই চারটা মারে তো একবার ক্লাসটা রাউন্ড দেয়। এতে যদি বাবু স্যারের রাগ কমে। এরই মধ্যে আমাকে আবার অফিসে পাঠাইছেন আরও কয়েকটি বেত আনার জন্য। বেত না পেলে যেন বাইরে গাছ থেকে ডাল ছিঁড়ে আনি।
নিজের পিঠে দুইটি বেতের অপমৃত্যু ঘটার পরও জনির কেমন কোন বিকার নেই।

এরই মধ্যে স্যার মার দিতে দিতে হালকা জিরিয়ে নিতেই জনি ক্লাস রুম থেকে এক দৌঁড় দিল। স্যারও পেছন পেছন দৌঁড়।
না দেওয়াল টপকিয়ে স্কুল পালানোর কোন চেষ্টা করেনি। জনি  এক দৌঁড়ে স্কুলের ছাদে। আমাদের স্কুলটা সাড়ে তিনতলা। মানে তৃতীয় তলার অর্ধেক কাজ হয়েছে। আমাদের ক্লাস হতো দ্বিতীয় তলায়।
জনি এক দৌঁড়ে দ্বিতীয় তলার ছাদে গিয়ে একটা রড় ধরে উঠে পড়ে তিনতলার ছাদে। এই ছাদে বাবু স্যার উঠতে পারছেন না। তবু তিনি ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
ছাদের একদম কিনার গিয়ে জনি ডাক দিচ্ছে ‘স্যার আর এক কদম যদি সামনে আসেন তবে আমি লাফ দিবো। আর এইখান থেকে লাফ দেই তবে আমার মৃত্যু নিশ্চিত। আর এই মৃত্যুর জন্য দায়ী থাকবেন আপনি!’
জনির এই হুমকিতে বাবু স্যার বিচলিত নন। তিনি আরও দিগুণ দেমাকে তিনতলাম ছাদে উঠার চেষ্টা করতে লাগলেন।
সে স্যারের বকুনিতে ছাদের একদম কিনার চলে যায়।জনি সত্যিই সত্যিই লাফ দিতে চায়!
এমন সময় ছাদের ছিল্লাছিল্লিতে দশম শ্রেণির ক্লাস থেকে জসিম স্যার চলে আসেন । জসিম স্যার আমাদের স্কাউট টিচার। তিনি ছাত্রদের কাছে জনপ্রিয় এবং বন্ধুসুলভ। বিকেলে আমাদের সাথে ভলিবলও খেলেন।
জসিম ঘটনা বুঝার পরও বাবু স্যারকে গিয়ে আমার জিজ্ঞেস করলেন,‘স্যার কি হয়েছে!’
ততক্ষণে ঘামে-ভয়ে বাবু স্যারের জবান আসছে না ঠিকমত। জনির কাছেও যেতে পারছেন না।আর গেলে জনি লাফ দিতে পারে। আমার তিনি ছাদ থেকে চলে গেলে জনি পালিয়ে যাবে ।
জসিম স্যারকে বলার পর স্যার জনিকে ডাক দেয়,‘ বাবা এমন করিস না। আমি অনুরোধ করছি। ফিরে আয়।’’
জসিম স্যারের কথায় জনি বিশ্বস্ত হলো বলে মনে হলোনা।

অনেক অনুনয় বিনয়ের পর সে ডাক দিয়ে বলে যদি বাবু স্যার সবাইকে শুনিয়ে কথা দেন,‘ তিনি আর কাউকে মারবেন না। এক গাদা গাদা পড়া দিবেন না’ তবে আমি নিচে নামব।

বাবু স্যার প্রথমে না করলেও পরে পরিস্থিতির কারণে সবার সামনে এই  স্বীকারোক্তি দেন।বেচারা যেকোন মূল্যে মসিবত থেকে উদ্ধারের অপেক্ষায় ছিলেন।আপাতত কথা দিয়ে জনিকে নামাক,তারপর দেখা যাবে ।

পরে জসিম স্যারের সাথে জনি নেমে আসে। এরপর আমরা সবাই ক্লাসে চলে যায়। উৎসুক কয়েকজন তাদের পেছন পেছন অফিসে যায়।বাবু স্যার চোখ বন্ধ করে কয়েক গ্লাস পানি খান।
পরে জনিকে জসিম স্যার জিজ্ঞেস করেছিল,‘ কিরে তুই কি সত্যিই সত্যিই লাফ দিতে গেছিলি নাকি !’
জনি যা বলছিল তা কোনদিন বাবু স্যারের কানে পৌঁছেছিল কিনা জানা নেই। না পৌঁছলেও তিনি বুঝতে পেরেছেন কিনা  জানি না। তবে এরপর থেকে বাবু স্যারকে আর কোনদিন বেত হাতে দেখেনি।
স্কুলে অনেকদিন   এই ঘটনার রেশ  ছিল। বাবু স্যার বেশ নরম হয়ে গিয়েছিলেন। ছাত্রদের সাথে খুব একটা কথা বলতেন না। ক্লাসেও খুব একটা প্যারা দিতেন না।
তবে অনেকেই এই ঘটনা নিয়ে মুখ  টিপে হাসতেন। আর দেখা হলেই জনিকে বলতেন ‘কিরে তুই এত নাটক কোত্থেকে শিখছিস!’
এই ঘটনার পর স্যারেরা হয়ত গাদা গাদা পড়া মুখস্থ করার অসম্ভাব্যতা,বেতের ভয়ে আমাদের আড়ষ্টতা বুঝতে পেরেছিলেন। হেডস্যার পরে অভিভাবক ডেকে সব ছাত্রদের জন্য মোবাইল ও শিক্ষকদের জন্য বেত নিষিদ্ধ করেছিলেন।পাঠদান প্রক্রিয়ার একটা আমূল পরিবর্তন হয়েছিল।

স্কুল পাশ করে বের হয়ে এসেছি। অনেকদিন পর আরেকটি বৃষ্টির দিনে আমরা স্কুলের গেইটে চায়ের দোকানে বসা। দেখি পঞ্চাশোর্ধ্ব এক লোক সাইকেল নিয়ে স্কুলে ফিরছেন। পেছনে ১৩-১৪ বছরের সাদা শার্ট পরিহিত এক বালক।
এই দৃশ্য দেখে মনে পড়ে গেল বাবু স্যাররা এভাবে জোর করে ক্লাসে আটকিয়ে রাখতেন বলেই আমরা মেট্রিকের পাঠ চুকাতে পেরেছি।
#……………………………….

লেখক
শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

শিক্ষার্থী,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

মন্তব্য

  1. ভাই তো ভাই। অসাধারণ বাস্তবধর্মী গল্পের হাত। কলম চলুক।

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!