পাহাড়ের বিবর্ণটা ও এক কাপড়ে বেঁচে থাকা আদিবাসীদের জনজীবন

()

স্বপ্নের জগতে পাহাড় এবং পাহাড়ের আদিবাসীদেরও যেন নিত্য নতুন স্বপ্নের শেষ নেই। পাহাড় স্বপ্ন দেখে ,পাহাড়ের আদিবাসীরা স্বপ্ন দেখে। কিন্তু তারা আদৌ জানেনা তাদের স্বপ্ন বাস্তবতায় পরিপূর্ণ হতে পারবে কিনা(?) নাকি স্বপ্ন কেবল স্বপ্নের অবাস্তবিক জায়গাতে থেকে যাবে।

স্বাধীন বাংলাদেশের বুকে পাহাড় এবং পাহাড়ের আদিবাসীরাও তাদের স্বাতন্ত্র্য অস্তিত্বে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছিলো বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকে। সেই স্বপ্নের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তথসময়ের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ(বর্তমানেও ক্ষমতাসীন) সরকারের সাথে আদিবাসীদের মধ্যকার একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। যার নাম দেয়া হয় “পার্বত্য চুক্তি”। যে চুক্তির মধ্যে আদিবাসীদের মৌলিক অধিকার সংবলিত দাবির ৭২টি ধারা/উপধারা রাখা হয়েছিলো। এই  “পার্বত্য চুক্তি”র মধ্য দিয়েই আদিবাসীরা স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে স্বাধীনভাবে নিজেদের মৌলিক অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার অহরহ স্বপ্ন দেখেছিলো। স্বপ্ন দেখেছিলো নিজস্ব ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও কৃষ্টিকে বুকে ধারণ করে বহির্বিশ্বে মাথা উচু করে একটি সভ্য জাতির পরিচয়ে বাঁচবে বলে। পাহাড়ের কোলে একটি চিরশক্তিধর সম্প্রীতির মেলবন্ধন সৃষ্টি করার লক্ষ্যে ৯৭-এর “পার্বত্য চুক্তি”টি ছিলো আদিবাসীদের প্রাণের দাবি। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়, ১৯৯৭ থেকে ২০১৯ এই ২২টি বছরে পার্বত্য চুক্তির সাফল্য কিংবা বাস্তবায়নের হিসেবের খাতায় আদিবাসীদের চাওয়া পাওয়ার জায়গাটা খুব একটা ভারি হয়ে উঠতে পারেনি। চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্য আংশিকআংশিক কয়েকটি ধারা বাস্তবায়িত হলেও বাস্তবায়ন হয়নি মৌলিক ধারাগুলো। তার মধ্য ভূমি সমস্যা অন্যতম একটি ধারা।

পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী সরকারের যা করার ছিলো সরকার তা করেনি। আদিবাসীদের প্রাপ্য আদিবাসীরা পায়নি। বরং সরকার পার্বত্য চুক্তি পরিপন্থী করে আদিবাসীদের প্রতিকূলে অবস্থান করার মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আদিবাসীদের অস্তিত্ব আমূলভাবে উৎখাত করার তৃঞ্চায় উঠেপড়ে লেগেছে। যার ফলে আদিবাসীদের মনে এখন হতাশার শেষ নেই।

পাহাড়ের প্রাসঙ্গিক কিছু কথাঃ

পাহাড় এখন বিবর্ণ। চরম বিবর্ণ। রাষ্ট্রীয় বর্বর আইন পাহাড়ের বুকে চাঁপিয়ে দিয়েছে সেনাশাসন নামের দাবানল। যে দাবানলের আগুনে পুড়ে ছাঁই হয়ে যাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী অস্তিত্ব। সরকারি বুলেটে নির্মমভাবে মারা হচ্ছে পাহাড়ের ভূমিপুত্রদের। ধর্ষণ করা হচ্ছে পাহাড়ী মা-বোনদের। কখনো সেনাবাহিনীর দ্ধারা ধর্ষণ করা হচ্ছে আবার কখনো সেটেলার বাঙালী দ্ধারা। ধর্ষণের পর কখনো গলাকেটে! কখনো যৌনাঙ্গে গাছের গুড়ি ঢুকিয়ে দিয়ে এবং কখনো শ্বাসরোধ করে  নৃসংশভাবে হত্যা করা হচ্ছে আদিবাসী নারী ও নারী শিশুদের। সেনাক্যাম্প, বিজিবি ক্যাম্প ও পুলিশ ফাঁড়ী সম্প্রসারনের নামে বাপ-দাদা চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে পাহাড়ের ভূমিপুত্র আদিবাসীদের। পর্যটনের নামে নিরীহ আদিবাসীদের হাজার হাজার একর জায়গা জমি দখল করা হচ্ছে। অপরদিকে ৭০/৮০’র দশকে অনুপ্রবেশ করা সেটেলার বাঙালী কতৃক আদিবাসীদের জায়গা জমি জোরপূর্বক দখল এবং আদিবাসীদের উপর নৃসংশতার কোন শেষ নেই।

এই তো গেল 2017 সালের 2 জুন, রাঙ্গামাটি জেলার লুংগুদুতে কি হয়েছিলো মনে আছে(?)। লুংগুদু যুবলীগ কর্মী ও মোটরবাইক ড্রাইভার “নুরুল ইসলাম নয়ন” নামের এক বাঙালী যুবককে কে বা কারা হত্যা করে খাগড়াছরি চৌদ্দ মাইল নামক এলাকায় ফেলে রেখে চলে যায় 2017 সালের 1 জুন। নুরুল ইসলাম নয়নের বাড়ি ছিলো লুংগুদু সদরের “বাট্টে পাড়া” এলাকায়। তারপর 2 জুন সেটেলার বাঙালীরা লুংগুদু সদরে নয়নের লাশটি নিয়ে জঙ্গি মিছিল বের করে। সেটেলার বাঙালীদের ঐ জঙ্গি মিছিলে যোগ দিয়েছিলো লুংগুদু থানা পুলিশ এবং লুংগুদু সেনা জোনের সেনাবাহিনীরা। সেটেলার বাঙালীরা সেদিন সকাল 10:00 টা থেকে 1:00 টা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয় এবং 1:30 টায় জমায়েত হয়। পরে 2:00 টার দিকে সেনা পুলিশের প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় লুংগুদু সদরের মোট 3টি আদিবাসী গ্রামে অগ্নিসংযোগের মধ্য দিয়ে হামলা শুরু করে আদিবাসীদের উপর। প্রাণভয়ে পালিয়ে যেতে থাকে স্থানীয় আদিবাসীরা। সেদিন 3টি আদিবাসী গ্রামের মোট 250+টি আদিবাসীদের ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দিয়েছিলো সেটেলার বাঙালীরা। 75 বছরের বৃদ্ধ ‘গুণমালা চাকমা’কে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছিলো নির্মমভাবে। যা বিশ্বের সমস্ত বর্বর ইতিহাসকেও হার মানিয়েছিলো।

নয়নকে কে হত্যা করেছিলো(?) কারা হত্যা করেছিলো(?) তার সুস্থ তদন্ত কিংবা বিচার বিশ্লেষণ না করেই 2017 সালের 2 জুন লুংগুদু আদিবাসীদের উপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছিলো কেবল সন্দেহের উপর নির্ভর করে সেদিন সেটেলার বাঙালীরা। এবং তাদেরকে মদদ দেয়া হয়েছিলো সেনা পুলিশের পক্ষ থেকে। এসব বর্বরতার বিচার হয়না! বিচার চাওয়া এবং বিচারের দাবি করাও দোষের!

পাহাড়ে অন্যায়ের বিচার হয়না। রাষ্ট্রীয় বর্বর আইন তার দানবীয় ক্ষমতার প্রভাবে পরাধীনতার শিকলে বন্দি করে রেখেছে পাহাড় এবং পাহাড়ের আদিবাসীদেরকে। সবমিলিয়ে পাহাড় এখন চরম বিবর্ণ।

রাষ্ট্রীয় বিমূখতা ও অনান্তরিকতায় পাহাড়ের আদিবাসীরা বর্তমানে চরম পশ্চাৎপদ। রাষ্ট্রীয় হীন দৃষ্টিভঙ্গীর প্রভাবে আদিবাসীদের জনজীবন এখন চরম বিপর্যয়ের মূখোমূখি অবস্থানে দাড়িয়ে আছে। তাদের নেই কোন সাংবিধানিক অধিকার, নেই কোন গণতান্ত্রিক অধিকার, নেই কোন রাজনৈতিক অধিকার, নেই কোন অর্থনৈতিক অধিকার, নেই কোন সামাজিক অধিকার। সর্বোপরি আদিবাসীদের জনজীবন এক কাপড়ে বাধা!!!

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

আপনি কি এই পোস্টটি দরকারী মনে করছেন?

সামাজিক মিডিয়াতে জানান!

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক তপন চাকমা

নিপীড়িত,নির্যাতিত,শোষিত,বঞ্চিত,সর্বহারা মেহনতি মানুষের পক্ষে থাকবো সদা সর্বদা

২ টি মন্তব্য

  1. আধিবাসী শব্দটা একদিন এদেশ থেকে নিশ্চিহ্ন হবে। ইতিহাস বলে সময়ের পরিক্রমায় সবকিছু দ্রুত বদলায়। পার্বত্য চুক্তি কাগজেই রয়ে গেলো।

    • তপন চাকমা

      স্বৈরতন্ত্রে আক্রান্ত একটা দেশ থেকে এর থেকে বেশি কিছু কি আর আশা করা যায়!!! দেশের নেতৃত্বদানকারীরা মনে প্রাণে চান না এদেশে আদিবাসী হিসেবে কোন একটি জাতিসত্বা তাদের স্বাতন্ত্র মৌলিক অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকুক। বড্ড লজ্জা হয়, ঘৃনাও হয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!