পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক সভা নিয়ে কিছু কথা

বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন গত ১৬ ও ১৭ অক্টোবর পার্বত্য চট্টগ্রাম সফর করে আইন শৃঙ্খলা বিষয়ক বৈঠক ও আলোচনা সভা করেছেন। ১৬ অক্টোবর তিনি হেলিকপ্টারযোগে প্রথমে খাগড়াছড়ির রামগড়ে যান এবং সেখানে একটি থানা ভবন উদ্বোধন করেন। এরপর ঐ দিন বিকালে তিনি রাঙামাটিতে গিয়ে তিন জেলার সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনের সাথে আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন।

পরদিন একই বিষয়ে তিনি রাঙামাটি সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে সরকারি দলের এমপি-মন্ত্রী, তিন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানসহ আমন্ত্রিত কিছু লোকজনের উপস্থিতিতে আরো একটি আলোচনা সভা করেন। এতেও সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন উপস্থিত ছিলেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রামগড়ে থানা ভবন উদ্বোধনকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সমতলের ন্যায় পার্বত্য চট্টগ্রামেও দুর্নীতি, মাদক ও সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান পরিচালনার কথা বলেছেন। একই সাথে তিনি সুন্দরবনের জলদুস্যুদের ন্যায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসলে পার্বত্য চট্টগ্রামের “সন্ত্রাসীদের” সাধারণ ক্ষমা করা হবে বলেও ঘোষণা করেছেন।

অন্যদিকে রাঙামাটিতে দু’ দফা আলোচনায় তিনি সমতলের জঙ্গী, মাদক পাচারকারীদের ন্যায় পার্বত্য চট্টগ্রামে “সন্ত্রাসী” নির্মুলের হুমকি প্রদান করেছেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এসব কথার প্রেক্ষিতে কিছু কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি।

প্রথমত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা সরকারের এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সুন্দরবনের জলদুস্যু সমস্যার মতো কোন সমস্যা নয়। এটা একটি রাজনৈতিক সমস্যা। এই সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে। অন্য কোন উপায়ে সমাধানের চেষ্টা করা হলে তার ফল হতে পারে নেতিবাচক। এটা কিন্তু সরকারকে মাথায় রাখতে হবে।

দ্বিতীয়ত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘সন্ত্রাসী ও তাদের গডফাদারদের’ নির্মুলের যে কথা বলেছেন প্রকারান্তরে তিনি রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের হত্যা বা নির্মুল করার হুমকিই দিয়েছেন বলে ধারণা করা যায়। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যার মধ্যে দিয়ে তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। তবে এটা স্পষ্টভাবে বলা যু্ক্তিসঙ্গত যে,  সমতলের ন্যায় পার্বত্য চট্টগ্রামে “সন্ত্রাসী বা গডফাদার” সংস্কৃতি চালু নেই। এখানে যা চলছে তা হচ্ছে রাজনৈতিক আন্দোলন। নিপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন। কাজেই, পার্বত্য চট্টগ্রামে আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হলে ‘৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছেন তারাও সন্ত্রাসী হিসেবে পরিগণিত হবে।

আর সমতলে জঙ্গী বিরোধী বা মাদক বিরোধী অভিযানের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে অভিযান চালিয়ে কিংবা ক্রসফায়ারে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী হত্যা করে, নিপীড়ন-নির্যাতন চালিয়ে তেমন কোন লাভ হবে বলে মনে হয় না। বরং তিক্ততা আরো বাড়বে। তবে সরকার এখানে যেটা করতে পারে তা হচ্ছে আঞ্চলিক দলগুলোর সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে বের করা। এটা করতে পারলে সরকারেরই লাভ হবে।

তৃতীয়ত, পার্বত্য চট্টগ্রামে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পেছনে সরকারের কী ভূমিকা তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বর্তমানে আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যেকার যে সংঘাত চলমান রয়েছে তার মূল কারিগর বা গডফাদার কিন্তু সরকার এবং তার পরিচালিত বাহিনী ও সংস্থাগুলো। মূলত কায়েমী স্বার্থ উদ্ধার করতেই সরকার বা তার সংস্থাগুলো ‌‘ভাগ করে শাসন করার’ কৌশল বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই সংঘাত জিইয়ে রেখেছে। এক্ষেত্রে সংঘটিত অন্যান্য ঘটনার কথা বাদ দিলেও খাগড়াছড়ি সদরের স্বনির্ভর বাজারের মতো একটি নিরাপত্তা বেষ্টিত জনবহুল এলাকায় প্রকাশ্যে দিবালোকে ৬ জন মানুষকে ভারী অস্ত্রের সাহায্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা যদি সঠিক তদন্ত হয় তাহলে এর পেছনে কাদের মদদ রয়েছে তা নিশ্চয় বেরিয়ে আসবে। কিন্তু তার সঠিক তদন্ত কি হবে?

চতুর্থত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পার্বত্য চট্টগ্রামে যে কোন মূল্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ অবশ্যই শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করতে চায়। কিন্তু দমন-পীড়ন চালিয়ে কি শান্তি ফিরিয়ে আনা যায়? যেখানে প্রতিনিয়ত নিরীহ লোকজনকে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পে ধরে নিয়ে কথিত সন্ত্রাসী সাজিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়, যেখানে রাত-বিরাতে ঘরবাড়ি তল্লাশি চালানো হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ নিরাপদে-নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারে না সেখানে শান্তির কথা বলা বাতুলতা মাত্র। শান্তি-শৃঙ্খলার ফেরানোর নামে আর কতকাল এভাবে পাহাড়িদের ওপর নিপীড়ন-হয়রানি চলবে? মাননীয় মন্ত্রী ও সরকারের কাছে এই প্রশ্নটি রইল।

পঞ্চমত, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ’৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চুক্তির কথা উল্লেখ করে পরিত্যক্ত সেনা ক্যাম্পের পাশে বিজিবি ও পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনসহ প্রয়োজনে সেনা ক্যাম্প বৃদ্ধির কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি পার্বত্য চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতিমূলক কোন কথা বলেননি। উপরন্তু উক্ত সভায় সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান বলেছেন “যারা সরকারের সাথে চুক্তি করেছিল সেই জনসংহতি সমিতির তখন যে সমর্থন ছিলো, তা এখন আর নেই। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা উচিত, এবং এগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবা উচিত” (পাহাড়২৪.কম)।  জিওসি’র  এ কথার মাধ্যমে কী এটাই বোঝানো হয়েছে যে, চুক্তি বাস্তবায়নের আর কোন প্রয়োজন নেই? তাহলে কী চুক্তির ভবিষ্যত এভাবেই শেষ হয়ে যাবে?

ষষ্ঠত, রাঙামাটি সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সরকারি দলের নেতা এবং সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারাই মূলত প্রতিনিধিত্ব করেছেন। যদিও রাজা দেবাশিষ রায়ও বক্তব্য রেখেছেন। কিন্তু যাদেরকে সমস্যা মনে করা হচ্ছে অর্থাৎ কোন আঞ্চলিক দলের প্রতিনিধিকে উক্ত আলোচনা সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ফলে এক তরফাভাবে সরকারি দলের লোকেরাই ইচ্ছেমত নানা মিথ্যা-বানোয়াট অভিযোগের ফিরিস্তি তুলে ধরেছেন। মনে রাখা দরকার, এই একপেশে অভিযোগের ভিত্তিতে সরকার যদি কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাহলে তা পাহাড়ি জনগণের কাছে কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না।

আমি আগেই বলেছি এ অঞ্চলের সমস্যা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। তাই আন্তরিক সদিচ্ছা দিয়েই রাজনৈতিকভাবে এর সমাধান করতে হবে। আঞ্চলিক দলগুলোর সাথে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে এর একটা যুতসই সমাধান বের করতে পারলেই সকলের জন্য মঙ্গল। কিন্তু তা না করে যদি খুন-গুম ও দমন-পীড়নের পথ বেছে নেওয়া হয়, তাহলে এতে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে তার দায় কিন্তু সরকারের ওপরই বর্তাবে।

লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার তালুক চাকমা

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!