নেতাজী সুভাষের রাজনীতিই সমাধান

নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু যে রাজনৈতিক ধারা শুরু করতে চেয়েছিলেন তা আমাদের এই অঞ্চলের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল বলেই মনেকরি। তাঁর রাজনৈতিক চেতনার জায়গাটা যদি আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে চাই তাহলে আমাদের বুঝতে হবে “ফরোয়ার্ড ব্লক” গঠনের রাজনীতিকে। ফরোয়ার্ড ব্লক যে চেতনার আলোকে গঠিত হয়েছিল তাকে যদি অগ্রসর করা যেত তাহলেই একমাত্র এই অঞ্চলের রাজনৈতিক গতিমুখ সমাজতন্ত্র অভিমুখী হতো।কারণ সুভাষ বসুর আপ্রাণ চেষ্টা ছিল এই দেশের আলোকে সমাজতন্ত্রের বয়ান। এবং এই বয়ানই হতো প্রকৃত বৈজ্ঞানিক বয়ান৷ চীনে কমরেড মাও সেতুঙ যে কাজ করেছেন বা করতে চেয়েছেন সেই কাজই নেতাজী করতে চেয়েছেন।


জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্র এই দুই চেতনার সম্মিলনের কথা বলে শুরু হয়েছে নেতাজীর বিপ্লবী রাজনীতি। এখন আমাদের বুঝতে হবে নেতাজীর এই সংমিশ্রণের রাজনীতির মৌলিক অবস্থান।সমাজতন্ত্র সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো নিয়ে বেশি কথা না বল্লেও চলে৷ এ বিষয়ে আমরা অনেক জানি! আমাদের বুঝতে হবে জাতীয়তাবাদ। নেতাজী যে জাতীয়তাবাদের কথা বলেছেন তা মূলত বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ নয়৷ জাতীয়তাবাদ শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভাবক। জাতীয়তাবাদী চেতনার গতি শেষ পর্যন্ত বুর্জোয়া রাজনীতির পক্ষেই যায়। তাও নেতাজীর জাতীয়তাবাদ সমাজতন্ত্র অভিমুখী। তার কারণ নেতাজীর জাতীয়তাবাদী প্রকল্পের মধ্যে জাতীয়তাবাদ অল্পই। মূলত নেতাজীর জাতীয়তাবাদের মধ্যে যতটা জাতি সংক্রান্ত অভিমান ছিল তার চেয়ে বেশি ছিল এই অঞ্চলের মানুষদের একটি ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক গোষ্ঠী আকারে আবির্ভাব ঘটানো। এই রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভাব হওয়া এখনকার সবচেয়ে দরকারী রাজনৈতিক প্রকল্প এবং এই গোষ্ঠীকে হতে হবে পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। এই গোষ্ঠী নির্মাণের রাজনীতিই হচ্ছে বিপ্লবী জাতীয় ঐক্য নির্মাণ, যার শক্তিকেন্দ্র হবে মেহনতী মানুষ। এই তত্ত্বের প্রকাশ ঘটেছে নেতাজী সুভাষের জাতীয়তাবাদী চেতনায়। আমরা যারা মার্ক্সবাদী সমাজতন্ত্রী (কমিউনিস্ট) ধারার সাথে যুক্ত কোনও না কোনওভাবে তারা সহজেই অনুমান করতে পারছি এই রাজনীতি কতটা বৈপ্লবিক!


কিন্তু সুভাষচন্দ্রের রাজনীতি আজও দুর্বল ও প্রায় পরাজিত। কেননা এই অঞ্চলের তথাকথিত মার্ক্সবাদীগণ এক সময় তাঁকে ফ্যাসিস্ট, বিশ্বাসঘাতক ইত্যাদি অভিধা দিয়ে ফরোয়ার্ড ব্লকের রাজনীতিকে ধ্বংস করেছেন আবার সুভাষ বসুর মত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা না থাকায় কাজের কাজ করতে পারেননি। তাঁদের ভূমিকা সুবিধাবাদ ও দক্ষিণপন্থী রাজনীতির বিকাশ ছাড়া খুব বড় কোনও অবদান রাখতে পেরেছে বলে মনেহয় না (মোটাদাগে বলতে গেলে)। সুভাষ বসুকে ফ্যাসিস্ট বলার সময় কমিউনিস্টরা তাঁর দূরদর্শী দৃষ্টিকে পরিমাপ করতে পারেন নি। সুভাষ বসুর পথই ছিল ফ্যাসিস্টদের জয়যাত্রা রোধের একমাত্র সহি পথ। আর এই ধরনের চিন্তা একা সুভাষ বসু করেছেন তাও নয়। বিখ্যাত মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক এন্টোনিও গ্রামসী এই ধরনের পর্যালোচনা করেছিলেন। নেতাজী যদি ফ্যাসিস্ট হন কমরেড গ্রামসীও ফ্যাসিস্ট! যদিও আমাদের অনেক কমরেড গ্রামসীকে অচ্ছুৎ ছাড়া কিছু ভাবেন না। সুভাষ বসু চাইছিলেন ফ্যাসিস্ট ও কমিউনিস্টদের (প্রধানত লেনিন-স্তালিনবাদী) মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রধান না হয়ে দ্বন্দ্বটা পুঁজিবাদ বিরোধী হোক আর ফ্যাসিস্টদের সাথে কমিউনিস্টদের যে দ্বন্দ্ব তা গৌণ হয়ে পড়ুক। এর ফলে ফ্যাসিস্টদের এই আচমকা উত্থান রোধ করা যেত। সমাজতন্ত্র কায়েম এর প্রশ্নকে সামনে আনা যেত। কমরেড গ্রামসী মুসোলিনির উত্থানকে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যদি তারা একই পার্টির সদস্য হিসেবে কাজ করতেন তাহলেই বরং সমাজতন্ত্রী (ফ্যাসিস্ট) নামক প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থান বাধাগ্রস্ত হতো। এর দ্বারা নস্যাৎ করা যেত সাম্রাজ্যবাদীদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। তাই নেতাজী বারবার চাইছিলেন হিটলার -মুসোলিনি-স্তালিনের মাঝে একটা শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে। কারণ হিটলার-মুসোলিনির এহেন কার্যক্রম যে সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের অংশ, স্তালিনের বিরুদ্ধে এহেন জেহাদ করানো যে সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র তা নেতাজী ভালোই বুঝেছিলেন। কিন্তু আমরা বুঝিনি! কমরেড স্তালিনকে যখনই আর পরাজিত করা গেলইনা তখন শুরু হল কুৎসা রটিয়ে দেয়া। এর মূলে যে গভীর ষড়যন্ত্র ছিল তা আমরা আজও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।


এবার আমরা আসতে পারি নেতাজীর ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র সংক্রান্ত প্রকল্পে৷ নেতাজী যে অবিভক্ত ভারতের কল্পনা করেছেন তার কাঠামো ছিল যুক্তরাষ্ট্রীয়। যার ফলে তথাকথিত একক জাতীয়তাবাদ বা উদীয়মান আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের কোনও সমস্যা তাতে হবার কথা ছিলনা৷ নেতাজীর ভারতীয় পরিচয়ের মূল লুকিয়ে ছিল যুক্তরাষ্ট্রীয়তায় এবং যা ছিল এই অঞ্চলের হাজার হাজার বছরের ইতিহাস ও সংস্কৃতি থেকে উত্থিত। কিন্তু আজ এই বিষয়টা পাশ কাটিয়ে যাবার প্রবণতা দেখা যায়।
আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা যদি আমাদের এই অঞ্চলের রাজনীতির গতিমুখ বামপন্থী ধারায় প্রবাহিত করতে চাই তাহলে আমাদের পথ হচ্ছে নেতাজীর চিন্তাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা। একথা ভারত, বাংলাদেশ সহ এই দক্ষিণ এশিয়া তথা সমগ্র “তৃতীয় বিশ্বের ” জন্য সত্য। আর আমরা যারা বাংলাদেশের মানুষ তাদের মনে রাখতে হবে আমাদের রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে নেতাজী রাজনীতি চর্চার ঠিক রাস্তা হল মওলানা ভাসানীর চেতনাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা৷ ১৯৫৭ সালের ন্যাপ গঠনের হঠকারী ভূমিকা ছাড়া আমরা বলতে পারি মওলানা ভাসানীর রাজনীতি হচ্ছে আমাদের রাষ্ট্রের জন্য নেতাজী সুভাষচন্দ্রের রাজনীতির “বিকশিত”রূপ।

শেয়ার করুন

ব্লগার আর্য সারথী

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।