নারী দিবস এবং আমাদের কর্পোরেট কালচার

নারী দিবসের ঠিক তিনদিন আগে এই মার্চ মাসেই একজন নারী লেখক এসেছিলেন  আমাদের এই দেশে। তেমন কিছুই না শুধুমাত্র মন খুলে কথা বলতে চেয়েছিলেন আমাদের সাথে। অথচ তথাকথিত নারীবান্ধব এই রাষ্ট্রে কথা বলবার মত সুযোগ হয়নি এই লেখকের। যেখানে একটি রাষ্ট্রে অরুন্ধতী রায়ের মত একজন লেখককে কথা  বলবার সুযোগ দেয়া হয়না তার অনুষ্ঠান পন্ড করে তাকে অপমান করা হয় সেখানে বেগুনি রঙ এর শাড়ি পড়ে, শহীদ মিনারে মোমবাতি জ্বালিয়ে, পার্টিতে গিয়ে সেলফি তুলে  কিংবা নারী নেত্রীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করে ফ্যাশন বন্দী আধুনিক নারী দিবস পালন করাটাকেই স্বাভাবিক মনে হয়। এইসব বেগুনি শাড়ী পরিহিত নারীদের মধ্যে একজন ও প্রতিবাদ করতে আসেন নি সেদিন। একজোট হয়ে একজন অরুন্ধতী রায়ের পক্ষে কথা বলেন নি। যেমনটা আজীবন হয়ে এসেছে তসলিমা নাসরিন এর বিপক্ষে।নারী  বান্ধব এই রাষ্ট্রে যেখানে ঘটা করে নারী দিবস পালন করা হয়, রোকেয়া দিবস পালন করা হয়, নারীর ক্ষমতায়ন বলে গলা ফাটানো হয় সেই রাষ্ট্রে একজন নারীবাদী লেখক তসলিমা নাসরিন এর জায়গা হয় না।

আমাদের দেশে নারী দিবস পালনকারী অধিকাংশ নারীরাই জানেন না নারী দিবস কি বা কেন এটা পালন করা হয়।

১৮৫৭ সালে মজুরি বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতো কারখানার নারী শ্রমিকেরা। রাষ্ট্রবিরোধী প্রতিবাদে অধিকাংশ সময়েই যেটা দেখা যায়, এক্ষেত্রেও তাই-ই হলো। সেই মিছিলে চলল সরকারি লেঠেল বাহিনীর দমনপীড়ন।

১৯০৮ সালে নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হল। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ, জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। এর পর ১৯১০-এ ডেনমার্কের কোপেনহাগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিলেন দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে। এখানেই প্রথম ৮ মার্চকে  আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দিলেন ক্লারা জেটকিন।

নারী দিবসের সূচনা হয়েছিল নারী শ্রমিকদের অধিকার সংরক্ষনের জন্য। কিন্তু সেটা এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্পোরেট সুবিধাবাদী ফ্যাশন সচেতন নারীদের জন্য বিশেষ দিবস।

অথচ যে সব নারী শ্রমিকদের আন্দোলনের ফসল এই নারী দিবস সেই সমস্ত নারীরা এই দিবসের কথা জানেনই না। তারা কোনপ্রকার সুবিধাও ভোগ করতে পারেন না। মূলত পুঁজিবাদিরা অন্যান্য জিনিসের মত নারীকেও এক ধরনের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন আর সেটা অনেক বেশি বোঝা যায় নারী দিবস বা রোকেয়া দিবসে টেলিভিশন চ্যানেল খুললেই। নারী দিবস উপলক্ষে বাজারে নতুন সাবান শ্যাপু লঞ্জ হয়। কাপড়ের  দোকানে নারী দিবস স্পেশাল কাপড় পাওয়া যায়। বিজ্ঞাপন চিত্রে নারীর শরীরকে উপজীব্য করে নারীকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানানো হয়। মূলত নারী দিবস পুঁজিবাদীদের ব্যবসার প্রচার এবং প্রসার এর জন্য একটি বিশেষ দিবস হয়ে উঠেছে। যেখানে হারিয়ে গেছে শ্রমজীবি নারীদের সংগ্রামের ফসল।

এমনিতে নারীদের জন্য বিশেষ দিন মানেই নারী এখনো মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি। এরপর যদি দিবসটিকে কর্পোরেট দালালেরা দখল করে বসে থাকে তবে নারীর নারী থেকে মানুষ হয়ে উঠা আরো বেশি কষ্টকর হয়ে যাবে।

নারীরা মানুষ। পুরুষের মত নারীর হাত পা চোখ কান সব কিছুই রয়েছে সুতরাং নারীকে জোর করে নারী দিবসের মোড়কে পেঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। নারী দিবসের যে মূল ইতিহাস সেই ইতিহাসের আলোকে শ্রমজীবি নারীদের অধিকার সংরক্ষন হতে পারে  এই দিবসের মূল প্রতিপাদ্য। কর্মস্থলে যে সব নারী নিয়মিত অত্যাচার এর স্বীকার হচ্ছে, তাদের কর্মপরিবেশ, বেতন ভাতা ইত্যাদি নিয়ে বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছে, নারী  দিবস  তার জন্য। যে নারীটি ধর্ষিতা হচ্ছে স্বামীর অত্যাচার সহ্য করছে, টাকার অভাবে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য হচ্ছে, নারী দিবস তার জন্য। যে নারীকে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে, বাল্য বিয়ে দেয়া হচ্ছে, ভিক্ষাবৃত্তি করতে হচ্ছে, নারী দিবস তার জন্য। সমগ্র পৃথিবীর  নারীদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের জন্য যে নারী প্রতিবাদ করছে নারী দিবস তার জন্য। বেগুনি শাড়ি পরে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে বসে থাকা কিংবা সেজেগুজে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়া নারীর জন্য নারী দিবস নয়।

তাই নারী দিবসে সেই সব নারীদের শ্রদ্ধা জানানো উচিত যারা আসলেই জীবন সংগ্রামে একজন সাহসী যোদ্ধা। যারা এইসব কর্পোরেট নারী দিবসের ধার ধারে না। যারা নিজেরা নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে পারে।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শুভ্রা গোস্বামী

শুভ্রা গোস্বামী। প্রগতিশীল এবং মুক্তমনা একজন মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার এন্ড পারফম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ থেকে স্নাতক শেষ করেছেন। বর্তমানে প্রিন্টিং এন্ড পাবলিকেশন স্টাডিজে স্নাতোকত্তোর পড়ছেন। থিয়েটার এর পাশাপাশি ফিল্ম নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন। আর লেখালিখি এক ধরনের নেশা।

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!