ধর্ম, ব্যক্তি, রাজনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনা

আলোচনার শুরুতেই বলে নেওয়া প্রয়োজন আমি কেন ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। এই বিষয়টা বুঝতে আমাকে প্রচুর সময় অতিক্রম করতে হয়েছে। আমরা যদি একটু সচেতনভাবে বুঝতে চেষ্টা করি তাহলে দেখব, আমরা ব্যক্তিকে কখনই জানতে পারি না।  আমরা যা জানি বলে প্রচার করি তা মূলত, ঘটনা সম্পর্কে সাময়িক ধারণা। আসুন আরো ভিতরে ঢুকে বুঝতে চেষ্টা করি। ধরেন, আব্দুল রহিম ও দীপক শীল দুই বন্ধু। এরা পরস্পর দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আমাদের কাছে সাধারণভাবে মনে হয় এরা দুইজন একই স্থানে, একই সময়ে অবস্থান করতেছে। কিন্তু ঘটনাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। এরা দুই বন্ধু পাশপাশি অবস্থান করছে বলে মনে হলেও দুইজনের স্থানের ভিন্নতা রয়েছে, সময়ের ভিন্নতা রয়েছে। আব্দুল রহিম কথা বলার বেশক্ষণ পরে দীপক শীল শুনতে পারে। আবার দীপক শীল কথা বলার বেশক্ষণ পরে আব্দুল রহিম শুনতে পারে। আদৌতে কথা যখন বলা হচ্ছে সেই সময়ে কেউ শুনতে পারছে না। ফলে এরা দুই বন্ধু কেউ কাউকে চূড়ান্তভাবে জানতে পারছে না। বরং পরস্পর পরস্পরের প্রতি একটা সাধারণ ধারণা করতে পারে। এই ধারণাকেই আমরা বলি অবস্থাগত সত্য। সত্য বলতে যে বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে তা সঠিক নয়। সময়, স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সত্য হাজির হয়। এই মহাবিশ্বের কোনকিছুই স্থায়ী নয়। একটা সময়ের পর তা শেষ হয়ে যায়। নতুন রূপ নেয়। কিন্তু জগৎ, জীবনের অবস্থাগত সত্য জানতে না পারার কারণে ব্যক্তিগণের মধ্যে তার বৃহত্তর সংখ্যক পূর্বসুরিরা স্থায়ী হতে চেয়েছে, স্থায়িত্ব চেয়েছে। পরিবর্তনকে বুঝতে পারেনি। কোন না কোন বদ্ধমূলে আটকে পড়েছে। আমরা যদি আরো একটু ভিতরে প্রবেশ করি তাহলে দেখব, দীপক শীল ও আব্দুল রহিম পরস্পরের অবস্থাগত সত্য জানতে পারলেও ঠিক সেই সময় পরস্পরের কি রকম অনুভব হচ্ছিল তা একমাত্র উভয়ে প্রকাশ না করলে জানা যায় না। তাই ব্যক্তির অনুভূতি, ব্যক্তির অবস্থাগত সত্য একান্তই ব্যক্তির। ব্যক্তিকে বুঝতে চাইলে, জানতে চাইলে তার যে পারিপার্শ্বিকতা ছিল তা দিয়ে বুঝতে হয়। অন্যথায় একজনের সময় দিয়ে অন্যজনের সময়কে বুঝতে যাওয়া সঠিক পদ্ধতি নয়। আমরা দেখে থাকব যে,পরস্পর ব্যক্তির মধ্যে কিছু সাধারণ মিল ও অমিল রয়েছে। এই অমিল গুলোকে আমরা বলতে পারি ব্যক্তির নিজস্বতার প্রকাশ। অমিল গুলো কিভাবে ব্যবহার হবে তা একান্তই ব্যক্তির নিজস্ব বিষয়। এইগুলোর ব্যাপারে বাহিরের কারো হস্তক্ষেপ চলে না। আবার ব্যক্তি নিজেও তার এই একান্ত বৈশিষ্ট্যগুলো অন্যের ওপর চাপাতে পারে না। চাপাতে গেলে তা সঠিক নয়।

ধর্ম একটা ব্যক্তিগত অনুভূতি। প্রত্যেক ব্যক্তির ধর্ম অনুভুতি একই রকম নয়। আবার কারো কারো ধর্মে বিশ্বাস নেই। সেইক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি একটা সত্য জেনে গেল, এবং তাকেই সঠিক মনে করে দলবদ্ধ হল, সমাজবদ্ধ হল, নীতি-নৈতিকতা, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, অর্থনীতি, রাজনীতি সবই নির্মাণ শুরু করল। তার অনুসারিরা তাকেই সঠিক মনে করে জীবন যাপন করলে আপনি কি মনে করেন, তার অনুসারিগণের কোন নিজস্বতা রয়েছে? আমরা কি জানি, সত্য হল অবস্থাগত। তাই প্রত্যেক ব্যক্তির একটা নিজস্ব সত্য রয়েছে। তবু যদি তাকে অন্যের সত্য অনুসরণ করতে হয় তাহলে বিষয়টা কি হল? আমি বিষয়টা সহজ করে বুঝি, এই প্রক্রিয়া ধর্ম সত্যের কাছে হাজার হাজার অবস্থাগত ব্যক্তির বিকাশ অসম্পন্ন থাকে। এখানে ব্যক্তির মুক্তি নেই। কারণ ধর্মকে সামাজিকভাবে, সাংস্কৃতিকভাবে ও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়। যখন একজনের সত্য উপলদ্ধিকে কেন্দ্র করে সকলকে সংগঠিত করা হয়, তা বড়ই বর্বরতা, অশিক্ষা ও মূর্খতা। এখানে বলে নেওয়া দরকার শুধু ধর্ম অনুভূতি নয়, সকল ধরনের ব্যক্তিগত অনুভূতি নিয়ে রাজনীতি করা, সংগঠিত হওয়া, সামাজিকরণ করার চেষ্টাই হল কর্তৃত্ববাদ।

তাই আমরা প্রস্তাব করি, সব ধরনের ব্যক্তিগত অনুভূতি যে গুলোর সঙ্গে অন্য ব্যক্তির সাধারণ মিল নেই তা রাজনীতির অংশ নয়। বরং ব্যক্তি যেন তার আলাদা বৈশিষ্ট্যগুলো বিকাশের পথে অন্যের দ্বারা বাঁধাগ্রস্ত না হয় সেই বিষয়ে রাজনীতি, রাজনৈতিক দল, সংগঠন, সমাজ ও রাষ্ট্রসংগঠন বিশেষ নজর দিবে। এইক্ষেত্রে রাষ্ট্রসংগঠনের ভূমিকা কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান। রাষ্ট্রসংগঠন সকল ব্যক্তির বিকাশ নিশ্চিতকরণে কাজ করবে। তাই কাউকে কোন ব্যক্তি অনূভূতি কে কেন্দ্র করে সংগঠিত হতে দিবে না, সমাজবদ্ধ হতে দিবে না, রাজনীতি করতে দিবে না। সংগঠন করার একমাত্র বিষয় হচ্ছে, প্রত্যেক ব্যক্তির কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য বা সাধারণ কর্মসুচির ভিত্তিতে।

 

লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার মোর্শেদ হালিম

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!