সোমবার , জুলাই ২২ ২০১৯

দ্বন্দ্ববাদের মূলনীতিসমূহ

বস্তুজগৎ এবং মানুষের চেতনা বিকাশের বিশ্বজনীন সংযোগ এবং বিশ্বজনীন নীতিগুলোর বিজ্ঞান হচ্ছে দ্বন্দ্ববাদ । এবার আমরা এর মূলনীতিগুলো আলোচনা করবো । (ক) বিকাশের বিশ্বজনীন সংযোগ ও মিথষ্ক্রিয়ার নীতি : বস্তু ও ব্যাপারসমূহের সংযোগ হলো বস্তুজগতের সাধারণ নীতি । পৃথিবীর সব বস্তু, প্রক্রিয়া ও ব্যাপারসমূহ অভিন্ন বস্তুগত চরিত্র থেকে উদ্ভুত হয় । বিশ্বজনীন : কোনো বস্তু বা ঘটনার জন্ম, পরিবর্তন, অর্থাৎ গুণগতভাবে এক নতুন অবস্থায় পৌঁছানো বিচ্ছিন্নভাবে সম্ভব নয় । সবসময় তা ঘটে অন্যান্য বস্তু ও ঘটনাসমূহের সাথে পরস্পর সংযোগ ও নির্ভরশীলতার মাধ্যমে । কোনো বস্তুর পরিবর্তন অন্যগুলোতেও পরিবর্তন ঘটায় । একে বলে বিশ্বজনীন । বিশ্বজনীন হচ্ছে বস্তু ও ব্যাপারসমূহের সব ধরন ও রূপের সংযোগ ।

মিথষ্ক্রিয়া : বিশ্বজনীন সংযোগের সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মিথষ্ক্রিয়া । বস্তু ও প্রক্রিয়াসমূহের একে অপরকে প্রভাবিত করার নামই মিথষ্ক্রিয়া । বস্তু ও ব্যাপারসমূহের মধ্যে মিথষ্ক্রিয়া ঘটলে সেগুলোর পরিবর্তন ও গতি ঘটে । বস্তুসমূহের মধ্যে অসংখ্য মিথষ্ক্রিয়া ঘটে । মিথষ্ক্রিয়ার এই জালটি সামগ্রিকভাবে হয়ে দাঁড়ায় বিকাশের বিশ্বজনীন প্রক্রিয়া । এঙ্গেলস বলেছেন, “পদার্থগুলোর আন্তঃসংযোগ এবং পারস্পরিক প্রতিক্রিয়াই তৈরি করে গতি ।” যেমন – সৌরজগতের গ্রহগুলোর সাথে সূর্যের মিথষ্ক্রিয়ার ফলে দেখা দেয় সূর্যের চারপাশে সেগুলোর গতি । চেতন ও অচেতন প্রকৃতির মধ্যে মিথষ্ক্রিয়ার ফলে উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের ও পরিবেশের পরিবর্তন হয় । উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে মিথষ্ক্রিয়া হলে প্রকৃতি ও মানুষের ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয় । পরস্পর নির্ভরশীলতা : বিষয়গত পৃথিবীর পদার্থ ও ব্যাপারসমূহ মিথষ্ক্রিয়া করে একে অপরকে পারস্পরিকভাবে নির্দিষ্ট করে, পরস্পরের উপর নির্ভর করে । প্রকৃতি, সমাজজীবন ও মানবচেতনার মাঝে পরস্পর নির্ভরশীলতা দেখতে পাওয়া যায় ।

যেমন – আধুনিক পদার্থবিদ্যা ইলেকট্রনের ভর ও তার গতির দ্রুতির পরস্পরনির্ভরশীলতা প্রমাণ করেছে । সমাজজীবনে বৈষয়িক সামাজিক সম্পর্কগুলো ব্যক্তিমানুষের মনে প্রতিফলিত হয়ে তাদের ভাবাদর্শ নির্দিষ্ট করে । মানবচেতনায় অনুভূতি ও প্রত্যয়গুলোর মধ্যে পরস্পর নির্ভরশীলতা আছে । গুরত্ব : বিশ্বজনীন সংযোগ ও মিথষ্ক্রিয়ার নীতি বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে বিরাট গুরুত্বপূর্ণ । এই নীতি পৃথিবীর বস্তুগত ঐক্য সম্বন্ধে জ্ঞান দেয় । বস্তুর গতি সম্বন্ধে সুগভীর উপলব্ধি যোগায় । রূপের বৈচিত্র : বিশ্বজনীন সংযোগ ও মিথষ্ক্রিয়ার রূপগুলো বহুবিচিত্র । সংযোগের রূপগুলোর চরিত্র ও বৈচিত্র নির্ধারিত হয় জগতের ঐক্য ও অখণ্ডতা দিয়ে, বস্তু ও ব্যাপারগুলোর বৈশিষ্ট্য দিয়ে । এগুলো প্রতিনিয়ত আছে গতি, পরিবর্তন ও বিকাশের অবস্থায় । বিকাশ চলাকালে বস্তুর পরস্পরের সাথে এবং বাকি পৃথিবীর সাথে সেগুলোর পরস্পরসম্পর্ক পরিবর্তিত হতে থাকে ।

যার ফলে বিশ্বজনীন সংযোগের রূপগুলো অত্যন্ত চলমান, জটিল ও বহুবিচিত্র । মিথষ্ক্রিয়ার রূপগুলোও সমান বিচিত্র । এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যান্ত্রিক, পদার্থগত, রাসায়নিক, জীববিদ্যাগত ও সামাজিক রূপ । এই রূপগুলোর প্রত্যেকটির মধ্যে অসংখ্য মিথষ্ক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত । প্রত্যেকটি রূপ অন্যান্য রূপের সাথে জটিল ও বহুবিধ মিথষ্ক্রিয়ায় প্রবেশ করে যুগপৎভাবে । সবশেষে বলতে হয় বিশ্বজনীন সংযোগ ও মিথষ্ক্রিয়ার প্রত্যয়টি মানুষের অবধারণার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । অবধারণার পুরা ইতিহাস হচ্ছে বিশ্বজনীন সংযোগ ও মিথষ্ক্রিয়ার সীমাহীন বিচিত্র রহস্যভেদের ইতিহাস এবং সেগুলোর প্রায়গিক ব্যবহারের ইতিহাস । বিকাশের নীতি : বিকাশের মূলনীতি হচ্ছে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া । পৃথিবীকে শুধু বস্তুর সমাহার হিসেবে দেখা হয় না । দেখা হয় প্রক্রিয়াসমূহের সমাহার হিসেবে । এখানে বস্তুকে আপাতত স্থিতিশীল দেখা যেতে পারে কিন্তু বস্তুসমূহ আছে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের অবস্থায় । এখানে সাময়িক পেছনের দিকে পরিবর্তন দৃশ্যমান হলেও শেষে প্রগতিশীল বিকাশই প্রতিষ্ঠিত হয় । সুতরাং বিকাশের মূলনীতি প্রগতিশীলতা । বিভিন্ন ধরণের পরিবর্তন বোঝাতে ব্যবহৃত প্রত্যয় : চলমান পরিবর্তনগুলোর গতিমুখ ভিন্ন ভিন্ন । এদের কোনটি হয় অন্যান্য পদার্থের সাথে সম্পর্ক রেখে পদার্থের গতি ।

কোনটি পদার্থের গুণ-ধর্মের পরিবর্তন । কোনটি বিপরীতগামী পরিবর্তন যেমন – জল থেকে বরফ এবং বরফ থেকে জল । আবার এমন পরিবর্তন আছে যাকে বিপরীতগামী করা যায় না , যেমন – ভ্রূণ থেকে জীবাঙ্গের বিকাশ যাকে আবার ভ্রূণে ফিরিয়ে আনা যায় না । কোনো প্রক্রিয়ার বিকাশ হয় নিম্নতর থেকে উচ্চতরে এবং সরল থেকে জটিলে । আবার কোনোটি বোঝায় উচ্চতর থেকে নিম্নতরে জটিল থেকে সরলে উত্তোরণ । সুতরাং বিকাশ, প্রগতি, প্রতিক্রিয়ার প্রত্যয় বা ধারণাগুলো ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন রকম পরিবর্তন বোঝানোর জন্য । বিকাশের সুস্পষ্ট গতিমুখ : বিকাশ হলো এক ধরণের গতি । বস্তু বা প্রক্রিয়ার ভেতরের গঠনকাঠামোর পরিবর্তন এই গতির সাথে যুক্ত । গঠনকাঠামোগত, গুণগত রূপান্তরকে বিপরীতগামী করা যায় না । সেগুলোর সুস্পষ্ট গতিমুখ থাকে সামনের দিকে । বিকাশ প্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার দ্বান্দ্বিক মিথস্ক্রিয়া : এক উচ্চতর ধরনের সংগঠনের দিকে আরোহী (inductive) বিকাশকে প্রগতি বলে ।

অন্যদিকে বিপরীত দিকের অবরোহী (deductive) বিকাশকে প্রতিক্রিয়া বলে । বিকাশ হলো প্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার এক জটিল দ্বান্দ্বিক মিথস্ক্রিয়া (intfraction) । এঙ্গেলস বলেছেন, দ্বন্দ্ববিদ্যার বিকাশের এই পদ্ধতিসমূহের দ্বারাই কেবল নিয়ত পরিবর্তনশীল পৃথিবী ও মানুষের সমাজকে জানা যেতে পারে । সুতরাং সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর গতিকে একটি দিকে, প্রগতির দিকে বা প্রতিক্রিয়ার দিকে বলা যায় না । প্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যেকার পরস্পর সম্পর্ক বস্তুজগতের এক ক্ষেত্র থেকে আরেক ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন হয় । তবে জৈব ও অজৈব সকল ক্ষেত্রে প্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার উপাদানগুলোর মিথষ্ক্রিয়া চলতে থাকে বিকাশের জন্য । সমাজের বিকাশ প্রগতির দিকে : মানুষের সমাজ বিকশিত হয় প্রগতির পথে যদিও তা সোজাসুজি নয় । বিপরীতগামী হওয়ার বহু ঘটনা ইতিহাসে দেখা গেছে । তবে সমাজবিকাশের সাধারণ গতিমুখটি আরোহী এবং প্রগতিশীল । ঐতিহাসিক প্রগতির যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের দিকে সকল জাতি এগিয়ে যাচ্ছে তা হচ্ছে সাম্যবাদী সমাজ । বিকাশের অধিবিদ্যাগত ধারণার বিপরীতে বস্তুবাদী দ্বন্দ্ববিদ্যার ধারণা সারগতভাবে বৈপ্লবিক । মানুষকে তা পারিপার্শ্বিক জগতের সকল প্রক্রিয়া ও ব্যাপারকে গতি ও বিকাশের মধ্যে দেখতে শিক্ষা দেয় । এটা বৈজ্ঞানিক অবধারণা ও বৈপ্লবিক রূপান্তরের জন্য এক বলিষ্ঠ হাতিয়ার ।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার লুৎফর রহমান

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!