তোমাকে বলছি…..কেন ফ্যাসিবাদ দূর হয় না

কুসংস্কারচ্ছন্ন, ধর্মান্ধ, ভক্তিবাদী কর্মী বাহিনী নিয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় না। ইতিহাস কি বলে, ইউরোপী বুর্জোয়ারা যখন গির্জার শাসন থেকে জনগণকে মুক্ত করল তখন রাজার সঙ্গে আপোস করতে হয়। স্বৈরাতন্ত্রকে সমর্থন দিতে হয়। কারণ পুরোহিতদের সঙ্গে লড়াই করার মতো সক্ষমতা বুর্জোয়াদের ছিল না। সেকালে পুরোহিতরা জনগণকে ব্যক্তিস্বাধীনতা দেয়নি। ঈশ্বরের কাছে মাথা বন্ধক রাখতে হত। কেননা ধর্মও একপ্রকার সমাজবাদী আন্দোলন। জোটবদ্ধভাবে ঈশ্বরের বিধি নিষেধ মান্য করতে হত। ধর্মে ব্যক্তির কোন অস্তিত্ব নেই। ব্যক্তি পুরোহিতের মধ্যস্থতায় ঈশ্বরের গোলাম। এই মধ্যস্থতার সুযোগে তৎকালীন পুরোহিতরা গির্জা থেকে চরিত্র সনদ প্রদান করত। অর্থ কড়ি আদায় করত। ব্যক্তিরা নিজস্ব কোন মতামত প্রদান করতে পারত না। কি খাবে? কি খাবে না? কি পড়বে? কি পড়বে না? সবই ধর্মগুরু ঠিক করে দিত। ফলে সাম্প্রদায়িক সমাজে একজনের ওপর আক্রমণ আসলে প্রত্যেকেই জোটবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করত। যা বুর্জোয়াদের ব্যবসা করার ক্ষেত্রে প্রধান বাঁধা ছিল। তারা ভাবলেন এই জোটবদ্ধতা, এই ঐক্যবদ্ধ সমাজ ভাঙতে না পারলে ব্যবসা বাণিজ্য করা যাবে না। তারা প্রচার শুরু করলেন ধর্ম ব্যক্তিগত। গির্জা জনগণকে শাসন করতে পারে না। ঈশ্বরের সঙ্গে ব্যক্তির সরাসরি যোগাযোগ হবে। এখানে পুরোহিতরা কারা? যারা চরিত্রের সনদ দেয়? তারা ঘোষণা করলেন, আমরা ঈশ্বরের বিরুদ্ধে নই, আমরা গির্জার অধর্ম গুলো থেকে জনগণকে, প্রত্যেক ব্যক্তিকে মুক্ত করতে চাই। আমরা মনে করি ব্যক্তির সঙ্গে ঈশ্বরের যোগাযোগে কোন মধ্যস্থতার দরকার নেই। গির্জার শাসন থেকে ব্যক্তিকে মুক্ত করতে হবে।
বুর্জোয়ারা ভাবলেন রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে ব্যবসা বাণিজ্যে মনযোগ দেওয়া যাবে না, মুনাফা বেশি আসবে না। বরং রাজার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে…যেন পক্ষে থাকে। পুরোহিতদের রাজনীতি থেকে বাহিরে রাখতে হবে। রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ। রাষ্ট্রের একক কোন ধর্ম থাকা যাবে না। রাজার কাজ হবে প্রত্যেক ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা না করা। তাই সমাজবদ্ধতা ভেঙে ফেলতে হবে। ব্যক্তি গুলোকে আলাদা করে ফেলতে হবে। তবেই নতুন নতুন পণ্য বিক্রি করা যাবে। আধুনিক মজুরি শ্রমিক তৈরি করা যাবে। অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করা যাবে। যেকোন আন্দোলনও দমন করা যাবে। ব্যক্তিকে ইচ্ছামতো ব্যবসার কাজে লাগানো যাবে। যা ধর্ম থাকলে করা যায় না।
তাই ধর্ম পরিচয় থেকে নাগরিক পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ করলে তুলা হল। মধ্যযুগের রাষ্ট্রচিন্তা বদলে গেল। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা বুর্জোয়ারাই তৈরি করল। নাগরিক অধিকার তৈরি হল। আধুনিক রাষ্ট্রে ধর্মের রাজনৈতিক কোন ভূমিকাই রাখা হল না। বরং ধর্মকে খন্ড করে করে ব্যক্তির মধ্যে ভাগ বাটোয়ার করে দেওয়া হল। যেন ধর্মীয় পণ্য তৈরি করে মুনাফা অর্জন করা যায়। এখানে বুঝা দরকার বুর্জোয়ারা গির্জার বিরোধীতা করে শুধু মুনাফার জন্য। ব্যক্তিগুলোকে কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা থেকে মুক্ত করা তাদের কাজ নয়। বরং ব্যক্তিজীবনে ধর্ম যতবেশি কঠোর হবে ততই ব্যবসা ঠিকে যায়।
আজ বুর্জোয়াদের নিয়ন্ত্রণে সারা দুনিয়া। ইউরোপের আধুনিক রাষ্ট্রগুলো থেকে ধর্মকে রাজনীতির বাহিরে রাখা গেলেও মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তা থেকে ধর্মকে বিতাড়িত করা যায়নি। এখানকার বুর্জোয়ারা শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি। এর পিছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে খ্রিস্টান পুরোহিতরা যে ভাবে গির্জা থেকে সাধারণ ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণ করত…এর থেকে ইসলামি পুরোহিতদের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। ইসলাম রাজনৈতিক ভাবে অনেক বেশি সুসংগঠিত। হযরত মোহাম্মদ মদিনাতে ইসলামি রাষ্ট্রের সূচনার মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক অঙ্গণে পা রাখেন। এর জন্য তাকে লড়াই সংগ্রাম করতে হয়েছে। ইসলামি মতাদর্শ হঠাৎ আকাশ থেকে পড়া কোন ঘটনা নয়। তাদের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পিছনে সংঘাতপূর্ণ রক্তাক্তের ইতিহাস রয়েছে। তারা হাওয়ায় ভেসে আসা কোন বিষয় নয়।
তাই মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতীয় রাজনীতিবিদরা স্বাধীনতা সংগ্রামে রাজনীতি থেকে ধর্মমুক্ত করতে পারেনি। ইউরোপীয় বুর্জোয়াদের মতো এখানকার বুর্জোয়া নেতারা রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে পৃথক করতে পারেনি। এক কথায় আধুনিক রাষ্ট্র বলতে আমরা যা বুঝি তা এখানে তৈরি হয়নি। এখানে পাশ্চাত্যের ন্যায় ধর্মীয়নেতাদের প্রভাব শেষ হয়নি। বরং ধর্মীয় জোটবদ্ধতা, সমাজবাদী আন্দোলন এখনও বিদ্যমান। এই অঞ্চলের বাস্তবতা হল ধর্মীয়নেতারা ব্রিটিশ রাজাকে তাড়িয়ে রাষ্ট্রকে আরো বেশি ধর্মীয় করেছে। ফলে ফিলিস্তিনি, মায়নমার ও কাশ্মির সমস্যা গুলো শেষ হচ্ছে না।
ভারতের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকলেও এখন কংগ্রেস ক্ষমতায় আসতে পারে না। বাংলাদেশে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকলেও রাষ্ট্রধর্ম পরিবর্তন করার মতো সামাজিক প্রেক্ষাপট নেই। সব মিলিয়ে পশ্চিমাদের আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতে গ্রহীত হয়নি। নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি।আজ আধুনিক ইউরোপী রাষ্ট্রগুলো কেমন আছে? তারা ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করে কতটুকু নাগরিক অধিকার পাচ্ছে? আর আমরা মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতীয় ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিরা কেমন আছি? আমাদের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি কোনটাই কি ইউরোপ থেকে পিছানো ছিল? নাকি ব্রিটিশ রাজার একচ্ছত্র উনিবেশিক রাজনীতির যাঁতাকলে তা হারিয়ে গেছে? রাজনৈতিক ভাবে কি আমরা অদক্ষ ছিলাম যে ব্রিটিশরা দখল করে নিল?
ইংরেজ দার্শনিক ডেভিড হিউমের নাম শুনে থাকব। তিনি একজন চরম বস্তুবাদী পন্ডিত। তিনি ঈশ্বরকে অস্বীকার করেন তার বিখ্যাত কার্যকারণ তত্ত্বে। এর ২৭ বছর আগে আল গাজ্জালি কার্যকারণের অনিবার্যতাকে অস্বীকার করেন। এই পারসিয়ান পন্ডিত আল গাজ্জালি তার দার্শনিক আলোচনা শুরু করেন সংশয়বাদ দিয়ে।
পাশ্চাত্যের থেলিস, সক্রেটিস, প্লেটোরা যখন ঈশ্বরকে পুরোপুরিভাবে বাতিল করতে পারেনি তখন ভারতীয় চার্বাকরা ধর্মগ্রন্থ বেদকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। বস্তুবাদী দর্শনের যাত্রা এখানেও শুরু হয়। কিন্তু তা বিকাশ হল না কেন? কারণ ভারতীয়দের চিন্তাপদ্ধতি ছিল আধ্যাত্মিকতা আর পশ্চিমাদের ছিল বিষ্ময় থেকে। পশ্চিমারা ঈশ্বরকে অস্বীকার আর ভারতীয়রা বেদকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে নাস্তিক হয়। এছাড়াও ইসলাম, খ্রিস্টান ও ইহুদি ধর্মগুলোও মধ্যপ্রাচ্যের চিন্তাধারণা। তাই পশ্চিমা আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তা যতদ্রুত ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা করতে পারছে মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতীয়দের জন্য তত সহজ ছিল না। আবার দীর্ঘদিন ব্রিটিশ রাজার উপনিবেশিক রাজনীতির প্রভাব তো ছিলই। তাদের চোখে আমরা আধুনিকতার সংজ্ঞা শিখেছি। আমাদের পন্ডিতরাও ইংরেজদের মগজে পরিচালিত। আমাদের রাজনীতি, আমাদের সাহিত্য, আমাদের রাষ্ট্রভাবনা আমাদের মতো করে কি তৈরি করতে পারছি? যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে কি ভারতীয় দর্শনের পাঠ্য আবশ্যক?
কি মনে হয় পৃথিবীকে ভাগ করে ফেললাম? আঞ্চলিকতাবাদী চিন্তা ভর করছে? এমনটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। পশ্চিমাদের সঙ্গে আমাদের দর্শনগত যে পার্থক্য রয়েছে তাকে অস্বীকার করে তো আর যাই হোক কোন যৌক্তিক আলোচনা আগাতে পারে না।
পশ্চিমাদের থেকে আমাদের দর্শন বেশি অগ্রসর, রাজনৈতিক কারণে পিছিয়ে আছি… চিন্তার এই পদ্ধতিও সঠিক নয়। বরং আমরা বিশ্লেষণ করে দেখতে পারি দুনিয়ার ব্যক্তিদের জন্য আগামীর পথ কি হবে? আধ্যাত্মিকতা চর্চায় আমরা পৃথিবীকে কোনদিকে নিয়ে যাবো? ইতিহাস যদি ভুলভাবে না জানি তাহলে ভারতীয়দের দ্বারাও বস্তুবাদী চার্বাকরা আক্রান্ত হয়েছে। জৈন ও বৌদ্ধ দর্শন বাঁধাগ্রস্থ হয়েছে। নৃতাত্ত্বিকভাবেই আমরা মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতীয়রা কিছুটা আবেগী। এরও কারণ আছে…তা হল আমরা ধনে মালে সমৃদ্ধ ছিলাম। মধ্যপ্রাচ্যের চিন্তা এখানেই আটকা পড়ে গিয়েছিল। ফলে জগৎ ও জীবনকে ব্যাখ্যা করার জন্যে নতুন নতুন ধর্ম আসে কিন্তু পরিবর্তনশীল বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠনি। অপরদিকে পশ্চিমারা ছিল ভ্রমণপ্রিয়। তারা পৃথিবীর বিভিন্ন জাযগায় ঘুরে বেড়ায়। তারা খ্রিস্টান মতাদর্শ গ্রহণ করে আবার ফেলেও দেয়। এরা আল গাজ্জালির সংশয়বাদ গ্রহণ করে আবার ফেলেও দেয়। পশ্চিমাদের চিন্তা কোথাও আটকা পড়েনি। এরা জগৎটাকে দেখেছে বিষ্ময়ের চোখে গতির মধ্য দিয়ে। আর মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিষ্ঠিত দার্শনিকরা ঈশ্বর থেকে বের হতে পারেনি। ফলে পশ্চিমারা মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতীয়দের দুর্বল বিষয় গুলো বুঝতে পারে। আমাদের কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, ভক্তিবাদ কে কাজে লাগিয়ে প্রায় ২০০ বছর প্রত্যেক্ষ এবং এখনও পরোক্ষভাবে শাসন করে চলছে। এর জন্য দায়িকে? যদি বলি আমাদের মূর্খ্যতা, আমাদের অশিক্ষা। আমাদের ভক্তিবাদ প্রবণতা এর জন্য দায়ি। আমরা জীবনকে ব্যাখ্যা করি আবেগ দিয়ে। কূপমণ্ডকতা থেকে বের হতে পারি নাই। পশ্চিমা বিদ্বেষী নই বরং আমরা তো নিজস্ব চার্বাক মতাদর্শকেও গ্রহণ করতেছি না। আমরা বেদকে এখনও ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছি না। পূজামণন্ডপ আমাদের টানে। ইদ এখনও মধ্যপ্রাচ্যে আনন্দ বয়ে আনে। রাজনৈতিক সংগঠন গুলোও ঢালাও ভাবে তা প্রচারে নামে। পরিবর্তনটা কারা আনবে?

আসিফ মহিউদ্দিন নাকি নাদিয়া ইসলাম? পিনাকি ভট্টাচার্য কে অনেকেই অপছন্দ করে। তাকে জামায়াতে ইসলামির দালাল বলে। তাদেরকে বুঝার জন্য কিছু পড়াশোনা করলাম। তাদের লেখা পড়লাম। কথা শুনলাম। তাদের উভয়ের বিশাল অনুসারি রয়েছে। পরস্পরকে আক্রমণ করতে দেখলাম। ফরহাদ মজহারের কিছু ভিডিও দেখলাম। সব মিলিয়ে আসিফ আর নাদিয়ার দ্বন্দ্ব শুধুই ব্যক্তিগত মনে হয়নি। একান্তই আমার এদের কাউকে খারাপও লাগেনি। কারণ এখানে দর্শনগত ও রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। তাদের সঙ্গে কিছু দ্বিমত থাকলেও তাদের চিন্তাকে সম্মান করি।

আমাদের ধারণা আসিফ মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতীয়দের কূপমণ্ডকতা, ধর্মান্ধতাকে শেষ করে দিতে চায়। নাদিয়া ও পিনাকি ধার্মিক নয়, জামায়াতে ইসলামির দালালও নয়…এরা ফরহাদ মজহারের পশ্চিমা বিদ্বেষী ধ্যান ধারণার দ্বারা প্রভাবিত মনে হল। নাদিয়ারা চায় ভারতীয় দর্শনকে সামনে আনতে। এরা যেহেতু অজ্ঞেয়বাদী তাই ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা, প্রেম-ভালোবাসাকে উপেক্ষা করতে পারছে না। কিন্তু আসিফ আধ্যাত্মিকতা শেষ করে দিতে চায়। আর তখনই নাদিয়াদের অভিযোগ আসিফ ধর্ম বিদ্বেষী, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতীয়দের মনস্তাত্ত্বিকতা বুঝতেছে না…বরং পশ্চিমাদের খেয়ে পড়ে দালালি করতেছে।
তাদের এই দ্বন্দ্বকে মোটেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বরং আসিফের আধুনিক রাষ্ট্র তৈরি হল অথবা নাদিয়ার জনগণের চাহিদা অনুসারে আল গাজ্জালির সংশয়বাদ প্রতিষ্ঠা হল…তাতেই কি জনগণের মুক্তি মিলবে?
আমরা রাশিয়া কিংবা চীনের সমাজতন্ত্রের আলাপে যাচ্ছি না। বরং যদি পুঁজিবাদকে ব্যাখ্যা করি তাহলে দেখব তা কোন একক দেশের বিষয় নয়। পুঁজিবাদ বিশ্বব্যাপী ধারণা। দুনিয়ার সমগ্র জায়গায় পুঁজির অসম বিকাশ হয়েছে। ধর্মের ভিন্নতা রয়েছে, বর্ণবৈষম্য রয়েছে, লিঙ্গ বৈষম্য রয়েছে, সংস্কৃতির ভিন্নতা রয়েছে, রাজনীতির ভিন্নতা রয়েছে। এত সবকিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স এই পাঁচটি দেশের সিদ্ধান্তের বাহিরে কি আমরা যেতে পারি? প্রাচ্য বানাম পাশ্চাত্য…আমাদের কি এইভাবে চিন্তা করা সঠিক হবে?
আমরা তা মনে করি না। দুনিয়া দুই ভাগে বিভক্ত। এখন বুর্জোয়ারা পৃথিবী পরিচালনার দ্বারা আধুনিক শ্রমজীবী তৈরি করতেছে। তারা বাজারের খোঁজে সারা পৃথিবীতে অবাদে ঘুরে বেড়ায়, কেউ বাঁধা দিলে যুদ্ধ শুরু হয়। মুনাফার জন্য বুর্জোয়ারা যেমন পুরোহিতদের পরাজিত করে রাজনীতি থেকে ধর্মকে আলাদা করল, ধর্মীয় সমাজবদ্ধতা ভেঙে দিল তেমনই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভেঙে সারা দুনিয়াতে ধর্মের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র, ভাষার ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র, অঞ্চলের ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র তৈরির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে…নামে মাত্র জাতীয় স্বাধীনতা দেয় মুনাফার উদ্দেশ্যে। এখানকার শিক্ষাদীক্ষাকেও আধুনিক শ্রমিক তৈরির পদ্ধতি মাত্র।
সবথেকে দুঃখজনক সংবাদ হল পুঁজিবাদ বিকাশের চরম সীমায় পৌঁছে গেলেও তার পতন হচ্ছে না। সে দুনিয়াকে ভাগ করে নিয়েছে। পরিকল্পিতভাবে যুদ্ধ বাধিয়ে সংকট তৈরি করে রাখে। হাজার হাজার ব্যক্তিদের হত্যা করে। অস্ত্রের ব্যবসা করে। অনুন্নত দেশ গুলো উন্নত হোক শেষ বিচারে তারা চায় না। এই কাজে তারা আজকাল ধর্মকেও ব্যবহার করে। ফলে পুঁজিবাদ এমনি এমনি চলে যাবে এই কথাটা সঠিক নয়। বরং পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় কোন ব্যক্তিই স্বাধীন নয়। তাকে মজুরি শ্রমিক বা মুনাফার দাস হয়ে বাঁচতে হচ্ছে। এখানে ব্যক্তিস্বাধীনতার সুযোগ নেই। পুঁজিবাদে প্রত্যেক ব্যক্তিই জাগতিক ঈশ্বর পুঁজির প্রার্থনা করে। অর্থ ছাড়া এই ব্যবস্থায় কিছুই সম্ভব নয় তা সকলেই জানে এবং অধিকাংশ ব্যক্তিই মেনে নিয়েছে।
আশার কথা হল অধিকাংশ মানলেও সকলেই পুঁজিকে ঈশ্বর বলে স্বীকার করে নেয়নি। এর বিরোধী শক্তি বিদ্যমান রয়েছে। তাই প্রথমত, আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয় আপনি কোন পক্ষে? দ্বিতীয়ত, আপনি কোন স্থানে রয়েছেন? সেই স্থানের ধর্ম কি? ভাষা কি? তৃতীয়ত, রাষ্ট্রের চরিত্র কি?
আমরা পুঁজিবাদের বিপক্ষে। আমাদের স্থান বাংলাদেশ। এখানে প্রচুর ধর্মান্ধ লোক রয়েছে, পাশপাশি ভাষাভিত্তিক উগ্রতাও রয়েছে। রাষ্ট্র ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করে। ব্যক্তির জানমালের কোন নিরাপত্তা নেই। রাষ্ট্র এখনও নাগরিক অধিকার গুলোও নিশ্চিত করতে পারেনি। কিংবা ১৪০০ বছরের ইতিহাসে অসংখ্য বার ধর্মীয় নেতারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পাইলেও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। আরো বিবাদ সৃষ্টি হয়েছে। তাই আমরা আধুনিক রাষ্ট্র কিংবা ধর্মীয় রাষ্ট্র উভয়ের একটা পর্যায়ে বিলুপ্তি দাবি করি। রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও ধর্মীয় ব্যবস্থা থেকে ব্যক্তিগুলোর স্বাধীনতা দাবি করি। মুক্তবাজারে কেউ কোটি কোটি অর্থ নিয়ে আবার কেউ-বা লক্ষ লক্ষ অর্থ নিয়ে এমন অসম প্রতিযোগিতা করবে তা হতে পারে না। সমাজকে আগায় নিতে চাইলে দ্বন্দ্ব থাকতে হবে। আর দ্বন্দ্ব করতে গেলে খেলোয়াড়দের অর্থনৈতিক সক্ষমতা সমান করতে হবে। অন্যথায় যে প্রতিযোগিতা তা মূলত খরগোশ আর কচ্চপের দৌড় প্রতিযোগিতার নামান্তর। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রত্যেক শিশুর বেড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট বা শর্ত গুলো সমান না করা যাচ্ছে ততক্ষণ বলা যায় না আসলে জলিলের থেকে সক্রেটিস বা রবীন্দ্রনাথ খুব মেধাবি ছিল।
এইটা কিভাবে সম্ভব?
কোন চিন্তা কখন কর্তৃত্ববাদী হয়? যখন কর্তা নিজেকে সঠিক এবং অপরিবর্তনীয় মনে করে, যখন চিন্তার প্রাতিষ্ঠানিকতা লাভ করে, যখন প্রাতিষ্ঠানিকতার ভিত্তি হিসেবে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক কর্তা নিজেই হয়। তাই নিজের চিন্তাই একমাত্র সঠিক নই, অবস্থা বদলাবে ও অর্থের মালিকানা সামাজিক…যদি এই ভাবে চিন্তা ও অনুশীলন করতে পারি তাহলেই সম্ভব ব্যবস্থাপনার দাসত্ব থেকে ব্যক্তির মুক্ত হওয়া। অন্যথায় গায়ের জোরে, বয়সের আবেগে কিংবা অতি উৎসাহী হয়ে যেকোন ফ্যাসিবাদ দূর করা যায় না।
লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার মোর্শেদ হালিম

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!