মঙ্গলবার , জুন ১৮ ২০১৯

“জমেলা বেগম কোনোদিন ‘ভালোবাসি’ শব্দটি শুনেছেন?

জমেলা বেগম একটি চরিত্র। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ‘পুরুষতন্ত্রে’র কষাঘাতে নিজেকে শেষ করে দেওয়া একটি চরিত্র। যে চরিত্রকে চিত্রিত করতে খুব কষ্ট হয় না। খুব সহজেই চিত্রায়ন করা যায়। এ লেখাটিতে জমেলা বেগম একজন ব্যক্তির নাম, কিন্তু ঘটনাগুলো একজন ব্যক্তির নয়- এটা পুরো সমাজব্যবস্থার লক্ষ লক্ষ নারীর বয়ে বেড়ানো চিত্র।

জমেলা বেগমের আটটি কন্যা সন্তান। সর্বশেষ কন্যা সন্তানটির বয়স সাড়ে চার বছর। বড় কন্যাটি ২৪-এর ঘরে। গড় হিসেবে জমেলার বয়স দাঁড়ায় ৩৮-৪০। এই বয়সে তার জরায়ুর মুখ ভেদ করে বের হয়েছে আট-আটটি কন্যা সন্তান। কারণ একটাই, তার স্বামীর একটি পুত্র সন্তান লাগবে। বংশের বাতি লাগবে। জমেলা বেগম নিজেও এ চিন্তাকে ধারণ করেন, কেননা সে এসমাজের একজন অবলা নারী। পুত্র সন্তান না হলে তার মাতৃত্বের পূর্ণাঙ্গতা পায় না। তার স্বামীর মুখে হাসির ছোঁয়া পায় না। এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে! জমেলা বেগম তাই আবারও গর্ভে সন্তান নিয়েছে, একটি পুত্র সন্তানের প্রত্যাশায়। সে খুব অসুস্থ। পুরো শরীরে পানি, শরীর ফুলে যায়। পূর্ববর্তী কন্যা সন্তানদের বেলায়ও তার একই অবস্থা ছিল। এটাতে তার যত ভয়! তার মানে কি আবারও সে কন্যা সন্তানের জননী হতে যাচ্ছে! প্রতিটি রাতই তার কাছে মৃত্যুপ্রায়।

এটা তো আট সন্তানের পরের চিত্র। কিন্তু যার একটি সন্তানও হয়নি, প্রথম সন্তানটি কন্যা হয়েছে- তারও দৃষ্টিভঙ্গি এখন পর্যন্ত অসংখ্য পরিবারে নেগেটিভ। নারীটিকে কুলক্ষ্মী বলে মূল্যায়ন করা হয়। এরপর কন্যা সন্তান পেটে ধরলে, মা-মেয়ে দুজনকেই জ্যান্ত পুঁতে ফেলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এই হুমকি নিয়ে নারীটির নয়মাসেরও অধিকসময় সন্তান পেটে ধরে রাখে। এরপর যখন দেখে না এটিও কন্যা সন্তান! তার দিন কি আর যায়? এ সমাজের মানুষের কত কথা, কত চিৎকার! কত অপবাদ নিয়েই তার বাঁচতে হয়Ñ এটাই নারীর জীবন! এর ব্যতিক্রম যেন ঘটতে পারে না, এর ব্যতিক্রম ঘটলে সমাজকে পাল্টাতে হয়।

ইহোক, জমেলা বেগমের আলাপেই আসি। তার এ অবস্থা দেখে দ্বিতীয় কন্যা সন্তানটির টেনশনের শেষ নেই। এই সমাজ, রাষ্ট্র, পুরুষ সবকিছুর প্রতি ঘৃণা জন্ম নিয়েছে। এই ঘৃণা তাকে ‘নারীবাদী’ হয়ে উঠতেও সাহায্য করছে। সে মনে করে, পুরুষ মানেই নিপীড়ক, পুরুষ মানেই নারীকে হেনস্থা করে। তা না হলে, কেন একটি পুত্র সন্তানের জন্য এতগুলো কন্যা সন্তানকে মূল্যায়ন করবে না? এ চিন্তা তাকে ‘নারীবাদী’ হিসেবে, প্রতিবাদকারী হিসেবে গড়ে তুললে আমি তাকে ছুঁড়ে ফেলতে পারি না। তাকে বুঝিয়েছি, এটাই সমাজবা¯Íবতা, এ সমাজবা¯Íবতায় তুই পড়ে গিয়েছিস। ভাবতে হবে এরকম হাজারও মায়েদের কথা, যে মায়েরা এখনও একটি পুত্র সন্তানের জননী হওয়ার জন্য সবকিছু করতে রাজি! এই সমাজ এটা শেখায়। উত্তরাধিকার না থাকলে কে খাওয়াবে, সম্পত্তির মালিক কে হবে? এখানেই পরিবার, ব্যক্তিগত, মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তির প্রসঙ্গ আসে। এখানেই পুঁজির প্রসঙ্গ আসে। পুঁজিবাদ কিভাবে মানুষকে মনুষ্যত্বহীন হিসেবে গড়ে তোলে। সম্পদের লোভে, সম্পদকে বাঁচানোর লোভে মানুষ কি না করতে পারে! পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার চিত্রে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থাকলে সহজেই চিত্রায়ন করা যায়।

বনসংগ্রামই একজন মানুষকে যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলে। এই জমেলা বেগমের মেয়েটি হয়তো একসময় যোদ্ধা হিসেবে গড়ে উঠবে। এই সমাজকে ভেঙ্গে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভ‚মিকা রাখবে। তার জন্য প্রয়োজন সঠিক দিশা, সঠিক নেতৃত্বের, সঠিক সংগঠকের, সঠিক সংগঠনের। ভুল রাজনীতি, ভুল পথে পা বাড়াতে সাহায্য করে। জমেলা বেগমের একটি পরিবারের চিত্র থেকেই এটা উপলব্ধি করা যায়।

এরকম বহু জমেলা বেগমের জীবন জেনেছি। এটা একটা প্রসঙ্গ। এরকম হাজারও প্রসঙ্গের দায় জমেলা বেগমদের নিতে হয়। সন্তানটি কালো হলো কেন, সন্তানটি শিক্ষিত হচ্ছে না কেন, সন্তানটি চরিত্র ঠিক নাই কেন, সন্তানটি কথা শুনে না কেন- সব দায় ঘরের নারীটির। ‘তোর মাইয়া, তোর পোলা তোর মতোই হইছে’ এটা এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কমন ডায়লগ। শ্রেণীবৈষম্যের একটা রাষ্ট্রব্যবস্থায় নারী নিপীড়িত জাতির মধ্যেও নিপীড়িত। নারীকে সন্তান ধারণ করতে হয়, লালন-পালন করতে হয়, ধর্ষণের শিকার হতে হয়, আগুনে পুড়ে মরতে হয়, এসিডে দগ্ধ হয়ে মরতে হয়, গলায় ফাঁস দিয়ে মরতে হয়, ওড়না পেঁচিয়ে মরতে হয়, বেপর্দা হলে মরতে হয়, শিক্ষিত হলে মরতে হয়, গান গাইলে মরতে হয়, নাচলে মরতে হয়- ঘর থেকে বের হলেই মরতে হয়! তারপরও নারীটি অবলা হিসেবে আখ্যায়িত হতে হয়! কারণ, নারী নিপীড়িতের মধ্যে নিপীড়িত।

সেই জমেলা বেগমের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে গতরাতে আমারও কষ্ট হয়েছে। নারীর কষ্টগুলো আমাকে বেশ ভাবিত করে, কষ্ট দেয়, দুঃখ দেয়, যন্ত্রণা দেয়Ñ সমাজের প্রতি ঘৃণা আরো বাড়ায়। যখন ভাবছিলাম, তার আরো একটি বাচ্চা হবে? ওই জরায়ু ভেদ করে আরো…? কি আছে তার জীবনে? প্রেম, ভালোবাসা, অনুভ‚তি, শারীরিক চাওয়া-পাওয়ার কোনোকিছুই কি আর অবশিষ্ট আছে! নাকি, সন্তান ধারণের জন্য বীর্য নেওয়ার মতো পরিস্থিতিটাই শুধু আছে? এখনও কি তার স্বামীর স্পর্শে শিহরিত হয়? কম্পন তৈরি হয়? জড়িয়ে ধরে চুমুতে ভাসিয়ে দেয়- কোনদিন দিয়েছে কি? এই আটটি কন্যা সন্তানের পেছনে তার যে অবদান, তা কি তার স্বামীটি স্বীকার করেছে কোনোদিন? ভালোবেসে আগলে রেখে ‘ভালোবাসি’ শব্দটি কোনোদিন উচ্চারণ করেছে কি! আমি সন্দেহ প্রকাশ করছি। কেননা, এ সমাজে লক্ষ লক্ষ নারী যৌনতার সুখটুকু পায়নি, বহু নারী জানেই না তার অর্গাইজম হয়, তার জরায়ুতে কোনো সুখানুভূতি হয়তো জীবনে কোনোদিন পায়নি! অবিশ্বাস্য লাগছে! তাহলে অনুসন্ধানে যান, ওই কৃষক নারীদের কাছে, কলকারখানার শ্রমিক নারীদের কাছে, অনেক নি¤œমধ্যবিত্ত নারীদের কাছে যান- পেয়ে যাবেন অহরহ তথ্য। তার প্রিয় মানুষের স্পর্শানুভ‚তি না পাওয়ার আকুতি!

মেলা বেগমদের এর থেকে মুক্তির উপায় কি? সকল মানবজাতির মুক্তিই যে জমেলা বেগমদের মুক্তি দিতে পারে। এটা ওই জমেলা বেগমদের বোঝানো জরুরি। একটি পুত্র সন্তানের জন্য জমেলা বেগমরা আটটি সন্তান নেবে না, তার পুত্র সন্তানের প্রয়োজন নেই বলে দৃঢ়ভাবে জানাবে- দৃঢ়তা ছাড়া মুক্তি মিলবে না। আমার ভালো লাগা, মন্দ লাগা না বুঝতে পারলে আমার কোনো সঙ্গীর প্রয়োজন নেই, আমি মানুষের সঙ্গ চাই বলে জমেলা বেগমদের চিৎকার দিতে হবে। তবেই যদি এ সমাজে একটা ধাক্কা লাগে। হেডকোয়ার্টারে আঘাত করার জন্য লক্ষ লক্ষ জমেলা বেগমদেরই শ্লোগানের ধ্বনি তুলতে হবে। আর সেজন্যই প্রকৃতপক্ষে ‘নারীমুক্তি’ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। যার ছায়াতলে ঐক্যবদ্ধ হবে লক্ষ লক্ষ জমেলা বেগমরা। তবেই মুক্তি মিলবে।

০৮.০৪.১৯

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার লাবণী মন্ডল

মূলত নারী, প্রাণ, প্রকৃতি, রাজনীতি নিয়ে লেখালেখি করি। কমিউনিস্ট মতাদর্শ ধারণ করি।

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!