ছেলেকে বড় ও মেয়েকে ছোট করে দেখা মনোভাবের পরিবর্তন

()

১৯৮৪ সালে পেইচিং সন্ধ্যায়, পেইচিং মিউনিসিপ্যালিতির মহিলা ফেডারেশন ও শিক্ষা ব্যুরো ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান পেইচিং শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য “আমার মা” এবং “আমার বাবা” শিরোনামের এক প্রবন্ধ রচনার প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। এতে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে ৩ লাখ ৮০ হাজার প্রবন্ধ পাওয়া গিয়েছিল। শিশু ও কিশোররা তাদের নিষ্পাপ, ছলনাবিহীন ও অকৃত্রিম শিশুসুলভ মন দিয়ে নিজের জগৎ পর্যবেক্ষণ করতে চেষ্টা করে। তারা নিজের নিজের মা ও বাবাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং হুবহু তাদের নকল করে। ফিনিক্স সাহিত্যের ব্যানারে ‘মা ও বাবা’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। সেখানে ২৯টি প্রবন্ধ বাছাই করে তা বিদেশী পাঠক-পাঠিকাদের জন্য বিদেশী ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে।উত্তরাধিকার ৭১ নিউজের এর পাঠক-পাঠিকাদের জন্য ধারাবাহিকভাবে প্রবন্ধগুলো প্রকাশ করা হয়েছে। এতে করে বাংলাদেশের পাঠক-পাঠিকারা আধুনিক চীন সমাজের শিশু ও কিশোরদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে একটা ধারণা পাবেন।

মা ও বাবা বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য এক দারুণ স্নেহময় ও শ্রদ্ধালু শব্দ। অতীতে মা ও বাবাকে নিয়ে সাহিত্য রচনা হয়েছে। বর্তমানে হচ্ছে। ভবিষ্যতেও মা ও বাবাকে রচনা হবে বড় বড় সাহিত্য। রচনা হবে গল্প, উপন্যাস, কবিতা নাটক বা সিনেমা। সন্তানেরা মা ও বাবার সাথে অসদাচরণ করলেও মা বাবা কখনো সন্তানদের অমঙ্গল কামনা করেন না। সন্তান বেড়ে ওঠেন মা বাবার স্নেহের আদরে, মা-বাবা টের পান তাদের সন্তান আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। আমাদের এই সময়ে এসে চিঠি নেই, ডাকঘরগুলোও অনেকটা ঝিমিয়ে গেছে। আর আমরা পত্র লিখি না। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমরাও পরিবর্তন হয়েছি। কারণ, পরিবর্তনই মানুষের ধর্ম। এখন যোগাযোগের মাধ্যম অনেকটা হাতের মুঠোয় এসে বন্দি। চাইলেই যেকোনো সময় যেকোনো কারো সাথে সহজেই যোগাযোগ করতে পারছি। এই প্রতিকূলতার মাঝে এসেও চিনের ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে ৩ লক্ষ ৮০ হাজার প্রবন্ধ পাওয়া গিয়েছে। যে প্রবন্ধে উল্লেখ করেছে তাদের মা-বাবাকে কাছে না পাওয়ার গল্প, কাছে পেয়ে একচোখোমি করার গল্প, ইত্যাদি। একজন সন্তানের প্রথম শিক্ষক মা ও বাবা। সাধারণত সন্তানরা অনুকরণপ্রিয় হয়। তারা ভালোবাসে অনুকরণ করতে। তারা সারাক্ষণ জুড়ে মা-বাবাকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। তাই তারা যখন বড় হতে থাকে তাদের স্বভাব চরিত্র, ভাব-ভঙ্গি অনেকটা মিলে যায় মা-বাবার সঙ্গে। তাই এমন পর্যবেক্ষণ নিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীর মা’র উদ্দেশ্য এক মনোমুগ্ধকর চিঠি। চিঠিটির বাংলা অনুবাদ হুবহু তোলে ধরা হলো।

“মা-র ছেলেকে বড়ো করে দেখা ও মেয়েকে ছোট করে দেখার মনোভাবের পরিবর্তন”

১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৩ দুপুর ২:২৩

ফিনিক্স সাহিত্য

দাদার প্রতি আমার মার বরাবরই ছিল একচোখোমি, সবটাতে দাদার কথাই তিনি ভাবতেন। আমার জন্য কখনো মাথা ঘামাতেন না। খেতে বসলে, মা বরাবর দাদার বাটিতেই খাবার তুলে দিতেন। কখনো আমার বাটিতে দিতেন না, যেন আমি তার নিজের সন্তান না। এরকম দেখলে আমার খুব রাগ হতো। আমি ভাবতাম: দাদা এমন কি অসাধারণ ব্যক্তি। ব্যাটাছেলে বইতো আর কিছু নয়! সবাই বলে: “আকাশটা ধরে আছে অর্ধেক পুরুষ, আর অর্ধেক নারী”। আমি সর্বদাই বিশ্বাস করতাম, বড় হলে আমার ক্ষমতা দাদার থেকে কোন অংশে কম হবে না। মাও একদিন না একদিন এ কথা বুঝতে পারবেন।

একদিন, স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে এসে খবরের কাগজ খুলতেই একটা কার্টুন আমার চোখে পড়ল। তাতে দেখানো হয়েছে, একটা দাঁড়িপাল্লার বা দিকে একটি ছেলে হাতে অনেক রকম ফল ও পুষ্টিকর খাবার নিয়ে গ্যাট হয়ে বসে আছে। আর দাঁড়িপাল্লার ডান দিকে একটি মেয়ে খুব মনমরা হয়ে বসে আছে, তার মা-বাব তার প্রতি গালিবর্ষন ও মারধরের অঙ্গভঙ্গি করছে। কার্টুনটির নিচে লেখা রয়েছে: “ কদাপি পুত্রকে অমূল্য মনে করে কন্যাকে অবজ্ঞা করবেন না”। কার্টুনটি দেখে আমার নিজের অবস্থার কথা মনে পড়ে। মনে হলো, আমি যেন দাঁড়িপাল্লার ওই ডান দিকের মেয়েটি। একথা ভেবে আমি খবরের কাগজ থেকে কার্টুনটি কেঁটে দেয়ালে লাগিয়ে দিলাম যাতে সেটা সহজে মা-র চোখে পড়ে।

সেদিন লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আমি অনেকক্ষণ কার্টুনটির দিকে তাকিয়ে রইলাম। রাত গভীর হয়ে তবুও আমার চোখে ঘুম নেই। হঠাৎ দরজা খুলে গেল , মা সন্ধ্যার শিফটের কাজ সেরে কারখানা থেকে বাড়ি ফিরলেন। তিনি খেতে বসবেন এমন সময় দেয়ালে লাগানো কার্টুনটি তার নজরে পড়লো। অমনি তিনি রেগে গিয়ে একটানে কার্টুনটি খুলে নিয়ে মাটিতে ছুঁড়ে ফেললেন। আমি ভয়ে আমার মাথাটা লেপের তলায় টেনে নিলাম। ঘরে আর টু শব্দটি নেই, চারদিকে নিস্তব্ধ। কিছুক্ষণ পর আমি লেপটা একটু ফাক করে তাকালাম মা যে কখন মাটি থেকে কার্টুনটি কুড়িয়ে নিয়েছেন তা টের পাইনি, দেখলাম তিনি তা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছেন। আমার ভয় হলো এবার মা নিশ্চয় আমাকে দারুন পিটুনি দিবেন। কার্টুনটি দেয়ালে না লাগালেই বোধ হয় খুব ভাল হতো। আমার আফসোস হতে লাগল। আমি একদৃষ্টে মা-র দিকে তাকিয়ে রইলাম। দেখলাম মা-র মুখে হাসি ফুটেছে আর তার কুচকে থাকা ব্রুটিও আবার টানটান হয়েছে। একটু পর তিনি কার্টুনটি টেবিলের উপরে রেখে হাতে চাপ দিয়ে তার ভাজগুলো সমান করে দিলেন এবং তাতে আঠা লাগিয়ে আবার দেয়ালে লাগিয়ে দিলেন। তখন আমি একটু দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম, যেন আমার বুক থেকে বিরাট পাথর নেমে গেল।

আমি যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই হলো। সত্যিই মা-র মনে ভাবের পরিবর্তন দেখা দিল। পরের দিন, আমি স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে এসে ঘরে ঢুকতেই দেখলাম, টেবিলের উপর বড় এক বাটি গরম ভাত আর তার উপর ছড়ানো হয়েছে অনেক তরকারী। মা হাসি মুখে আমাকে বললেন: “ উ শুয়াং, এখনি খেতে বোসো, নইলে খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে”। খাবার শেষ হয়ে গেল আমি বাটি ধুতে গেলে মা আমাকে স্নেহের সংগে বললেন: “ তোমার ধুতে হবে না। তাড়াতাড়ি হোম-ওর্য়াক শেষ করো। পরে ঘরের সব কাজ তুমি আর দাদা শেষ করে নিও ভাগাভাগি করে”। মা-র কথা শুনে আমার প্রান জুড়িয়ে গেলো।

আমি হাতে কলমটা নিয়ে লিখতে বসতেই দাদাও হোমওর্য়াক করতে এলো আর একলাই টেবিলের অর্ধেকটার বেশি জায়গা দখল করে নিলো। ঠেলা-ঠেলিতে আমার আর বই খাতা রাখার জায়গা রইলো না। রেগে অধৈর্য হয়ে দাদার সাথে ঝগড়া শুরু করে দিলাম। ঝগড়া যখন বেশ তুংগে, তখন মা রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। ঝগড়ার কারনটা শুনে তিনি বেশ কড়া ভাবে দাদাকে বললেন: “ তুমি হলে ওর দাদা, বোনের কথা তোমার শুনা উচিত”। তিনি আরও বললেন আমার হোমওর্য়াক শেষ করার জন্য দাদা যেন আমাকে জায়গা ছেড়ে দেন।

এই প্রথমবার মা ন্যায্য কথা বললেন। খুশিতে আমার মুখ থেকে কোন কথা বের হলো না। আমি ভালোভাবেই বুঝলাম মা-র মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। এরপর অনেক ব্যাপারে আমি দেখেছি মা-র আগের মতন নেই। একচোখোমি মনোভাব নেই।

লিখেছেন: উ শুয়াং (ষষ্ঠ শ্রেণী)

অনুবাদ: কাও ছেংছুয়ান

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  • 10
    Shares

লেখক অসীম বড়ুয়া

শিক্ষা নয় সুশিক্ষা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: এই ব্লগের লেখা কপি করা যাবে না