ঘরে বাইরে সংকটের মুখে সৌদি যুবরাজ

()

২০১৭ সালে নাটকীয়ভাবে তৎকালীন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে নিজের ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে যুবরাজ ঘোষণা করেন সৌদি বাদশা সালমান। একই বছরের নভেম্বরে ২০০ জন প্রিন্স, ব্যবসায়ী এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ লোককে গ্রেফতার করে কোন অভিযোগ ছাড়াই  রিয়াদের রিৎজ কার্লটন হোটেলে আটকে রাখেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। দুর্নীতিবিরোধী অভিযোগ দাবী করে আটকদের বলা হলো মুক্তি পেতে হলে তাদের শত শত কোটি রিয়ালের ‘দুর্নীতিলব্ধ অর্থ রাজকোষে দিতে হবে। বিশ্লেষকদের দাবি এটা ছিল মূলত নতুন যুবরাজকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে রাজপরিবারের সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা।

ক্ষমতায় আসার পর পশ্চিমা মিডিয়া যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানকে এমবিএস উপাধি দিয়ে আধুনিক মনস্ক ও সংস্কারক তরুণ হিসাবে তুলে ধরেন। কিন্তু দেশে ও বিদেশে নানা বিতর্কিত কর্মকান্ড ও কূটনৈতিক অদক্ষতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছে এই উচ্চ বিলাসী তরুণ যুবরাজ। ২০১৮ সালে সৌদি আরবের ইস্তান্বুল দূতাবাসে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে থাকা সাংবাদিক জামাল খাসোগী হত্যাকান্ড ঘটে। এই হত্যাকান্ড যুবরাজ সালমানের নির্দেশে হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয় আন্তজার্তিক গণমাধ্যমে। ফলে মার্কিন সিনেটরসহ পুরা বিশ্বে নিন্দার ঝড় উঠে যুবরাজ ও সৌদি আরবের বিরুদ্ধে।ফলে এমবিএসের উচ্চাকাঙ্খী বিনিয়োগ সম্মেলনও ভেস্তে যায়।২০১৭ সালের নভেম্বরে সৌদি আরব সফরে যান লেবাননের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি। সৌদি বাদশাহ সালমান ও যুবরাজ বিন সালমান জরুরি সাক্ষাতের কথা বলে হারিরিকে রিয়াদে ডেকে নিয়েছিলেন। সেখানে তাঁকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ফ্রান্সের মধ্যস্থতায় একটা সমঝোতা হলেও এই ঘটনা কূটনৈতিব শিষ্টাচার বহির্ভূত বলে নিন্দা হয়।

সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের কথা বলে ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনে অভিযান পরিচালনা করছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। এই যুদ্ধে কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। কিন্তু কোনভাবেই সৌদি জোটের জেতার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বরং হুতি বিদ্রোহীদের দ্বারা  সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল স্থাপনায় এ যাবতকালের মধ্যে সবচেয়ে বড় হামলা হয়। ফলে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুবরাজ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিন সালমান বা এমবিএসের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে খোদ রাজ পরিবারে।

আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দী ইরানের সাথে সবচেয়ে উত্তেজনাকর সম্পর্ক যাচ্ছে সৌদি আরবের।এরই মধ্যে  ২০১৭ সালের জুন মাসে সৌদি আরবসহ প্রতিবেশী কয়েকটি দেশ কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং দেশটির ওপর কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করে। একই বছরে রিয়াদে অনুষ্ঠিত আরব- ইসলামিক- মার্কিন সম্মেলনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশকে দাওয়াত দেওয়া হলেও ডাকা হয়নি তুরস্ককে।ফলে কাতার সংকটের সময় তুরস্ক ও ইরান দৃঢ়ভাবে কাতারের পাশে দাঁড়ায়। দীর্ঘদিনের মিত্র ও আন্তজার্তিক রাজনীতিতে গুরত্বপূর্ণ দেশ কাতার চলে গেল শত্রু ব্লকে। এমবিএসের ভারসাম্যহীন কূটনীতির কারণে শত্রুদের মধ্যে একটি সৌদি বিরোধী ঐক্য গড়ে উঠে। এছাড়া সিরিয়া যুদ্ধে সৌদি বলয় হেরেছে ইরান বলয়ের কাছে। লিবিয়ায়ও সৌদি-আমিরাত ব্লকের বিপরীতে জয়ের পথে তুরস্কের ব্লক। ইরাকেও ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে উঠছে ইরান। চলমান ইয়েমেন যুদ্ধের কারণে সৌদি সীমান্তেই এখন শত্রুর বসবাস।  কুয়ালালামপুর সাম্মিটের মাধ্যমে সৌদি বিরোধী মুসলিম দেশের ঐক্যের একটি প্লাটফরম দাঁড়িয়ে গেছে। ফলে মুসলিম বিশ্বে স্পষ্ট বিকল্প শক্তি তৈরী হয়ে গেছে যার নেতৃত্বে তুরস্ক-ইরান-কাতার।

তবে আরব আমিরাতের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন জায়েদ ও সৌদি যুবরাজ মার্কিন ও ইসরাইল ব্লকের সাথে সম্পর্ককে দৃঢ় করেছে। মূলত সৌদি ও আরব আমিরাতের অর্থায়নে ও ইসরাইলি পরিকল্পনায় মিশরে সরকার পরিবর্তন করা হয়। লিবিয়ায় সংঘর্ষ চললে সুদানে ও ইথিপিওয়ায় নিজেদের প্রভাব তৈরী করছে সৌদি আরব।এর বিপরীতে আলেজেরিয়া, গাম্বিয়া ও সেনেগালকে নিজ ব্লকে নিয়েছে তুরস্ক।

সুন্নি মুসলিম বিশ্বে যখন সৌদি আরবের একক নেতৃত্ব প্রশ্নের মুখে তখন ফের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের গুঞ্জন উঠেছে সৌদি রাজপরিবারে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলছে, কথিত এক অভ্যুত্থান চেষ্টায় জড়িত থাকার অভিযোগে গত শুক্রবার বাদশা সালমানের এক ভাই ও ভাতিজাসহ রাজপরিবারের সিনিয়র তিন সদস্যকে আটক করা হয়েছে সৌদি আরব। আটক ব্যক্তিরা হলেন বাদশা সালমানের ছোট ভাই প্রিন্স আহমেদ বিন আবদুল আজিজ, সাবেক যুবরাজ ও আহমেদ বিন আবদুল আজিজের ছেলে মোহাম্মদ বিন নায়েফ এবং রয়েল কাজিন প্রিন্স নাওয়াফ বিন নায়েফ। এর মধ্যে প্রথম দু’জন সৌদি আরবে বড় ধরনের প্রভাবশালী। বর্তমান সৌদি বাদশাহ বেশ বয়োজেষ্ঠ্য। সৌদি রাজ পরিবারের নিয়ম অনুযায়ী বর্তমান যুবরাজের পাশপাশি এ পদে তার বিকল্প হতে পারতেন নতুন আটক দুই জনই।   সিনিয়র অন্য প্রিন্সদের মধ্যে মোহাম্মদ বিন নায়েফ ছিলেন ক্ষমতার পরবর্তী উত্তরাধিকারী। এর আগে একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তাকে সৌদি আরবে আল কায়েদাকে পরাজিত করার কৃতিত্ব দেয়া হয়।

অন্যদিকে প্রিন্স আহমেদও বেশ জনপ্রিয় রাজপরিবারে। সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা  দেশটির সাবেক বাদশাহ কিং আব্দুল আজিজ। তার স্ত্রীদের মধ্যে সবথেকে প্রিয় ছিলেন হুসসা বিনতে আহমেদ আল-সুদাইরি। তাদের সাত ছেলে পরবর্তীতে পরিচিত হয়  ক্ষমতাধারী সুদাইরি সেভেন নামে। সেই সাত জনের মধ্যে দুজন এখনো বেঁচে আছেন। যার মধ্যে একজন হচ্ছেন সৌদির বর্তমান শাসক বাদশাহ সালমান ও আরেকজন হচ্ছেন  ভাই প্রিন্স আহমেদ। তাকে দেখা হয় ক্ষমতার পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে। ২০১৭ সালে অনেক উর্ধতন প্রিন্সকে সরিয়ে এমবিএসকে যুবরাজ করলে বিরোধীতা করেন প্রিন্স আহমেদ। পরবর্তীতে গ্রেফতার আতঙ্কে দেশ ছাড়েন তিনি। কিন্তু ইয়েমেনে সৌদি জোটের হামলা, পরাজয় ও মানবিক সংকটের জন্য বর্তমান বাদশাহ ও যুবরাজ এমবিএস এবং রাষ্ট্রের আরো কিছু কর্মকর্তাদের দায়ী করেন প্রিন্স আহমেদ।তবে এরপরে গ্রেপ্তার না হওয়ার আশ্বাসে দেশে ফিরেন প্রিন্স আহমেদ। কিন্তু গত শুক্রবার বাদশাহর বিশেষ তলবের কথা বলে গ্রেফতার করা হয়  বর্তমান বাদশাহর জীবিত একমাত্র ভাই এই প্রিন্স আহমেদকে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল তাদের প্রতিবেদনে দাবি করছে আগামী নভেম্বরের আগে বাদশাহ সালমান জীবিত থাকতেই বাদশাহ’র দায়িত্ব পেতে চান সালমান।সে লক্ষ্যে সিংহাসনের উত্তরাধীকারী এই দুই প্রিন্সকে ধরপাকড়।তবে এভাবে বারবার ধরপাকড় করে নিজেকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিচ্ছেন তরুণ এই যুবরাজ। এছাড়া করোনা ভাইরাসের কারণে ১৯৯১ সালের পর তেলের সবচেয়ে সর্বনিম্ন। দাম ধরে রাখার ব্যাপারে সৌদি-রাশিয়া সমঝোতা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এর প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে। মার্কিন নির্বাচনের আগ মুহুর্তে মার্কিন অর্থনীতি কোনরুপ মন্দা ডোনাল্ট ট্রাম্পের নির্বাচনে জেতাকে অনিশ্চিত করবে। কোনভাবে সামনের মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্রেটরা ক্ষমতায় আসলে তবে এমবিএসের ভবিষ্যত আশঙ্কায় পড়বে। কারণ খাসোগী হত্যাকান্ড ও ভিন্নমতালম্বীদের দমন করার অভিযোগে ডেমোক্রেট শিবিরের তীব্র সমালোচনা রয়েছে সৌদি যুবরাজের। ফলে ঘরে বাইরে একটি সংকটপূর্ণ ভবিষ্যত অপেক্ষা করছে যুবরাজ বিন সালমানের জন্য।

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

আপনি কি এই পোস্টটি দরকারী মনে করছেন?

সামাজিক মিডিয়াতে জানান!

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

একটি মন্তব্য

  1. আমি ব্যক্তিগতভাবে আন্তর্জাতিক বিষয়ে বেশ অজ্ঞ। নতুন ভাবনা দোল দিলো লেখাটা পড়ে। ধন্যবাদ ভাই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!