গলাকাটুনী

()

 

আমার পাঁচ বছর বয়সী পুত্র চাঁদ আজ আমাকে জোর গলায় বলল, “আমি গলাকাটুনীকে ভয় পাই না, বাবা!”
“বাহ, দারুণ তো, সাবাস! তুমি নিশ্চয়ই ছেলেধরাকে গলাকাটুনী বলছ?”
“সবাই তো তাই বলে, রাফিও বলে, রাফির মামণিও বলে। আরিয়ানও বলে, আরিয়ানের মামণিও বলে! আর ওরা তো গলাই কাটে! তুমি কিচ্ছু বুঝ না, বাবা!”
“বাহ, নামটা পছন্দ হয়েছে!”
“আচ্ছা বাবা, শেখ হাসিনাও কি গলাকাটুনী?”
“হায়! কী বলছ তুমি! শেখ হাসিনা তোমাদের খুব ভালবাসেন, বাবা। তিনি তোমাদের মতো শিশুদের খুব আদর করেন।”
“কিন্তু রাফির মামণি যে বলল, শেখ হাসিনা হইল গিয়া সবচাইতে বড় গলাকাটুনী!”
এড়িয়ে গেলাম পুত্রকে। বললাম, “তুমি এখন খেলতে যাও, বাবা। দূরে কোথাও যেও না!”
যতই মুখে বড় কথা বলি, গলাকাটুনীর ভয় পায় না এমন মা-বাবা বাংলাদেশে নেই।
ছেলে আমার খেলতে চলে গেল রাফিদের উঠানে।
আর আমার ভাবনার দেয়ালে পড়ল হাতুরির আঘাত।

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, ডোন্ট মাইন্ড
লোকে আপনাকেই দায়ী করছে, করতে শুরু করেছে। একটু কি ভাববেন না?
একজন নেতার লক্ষ্য থাকে পরবর্তী প্রজন্ম। তিনি নিশানা করেন, পরবর্তী প্রজন্ম কোন শিক্ষা নিয়ে এবং কীভাবে বেড়ে উঠবে। আপনার যে এমন কোনো লক্ষ্য নেই, তা আমরা খালি চোখেই দেখতে পাচ্ছি।
আপনার লক্ষ্য দেশ কিংবা মানুষ নয়, আপনার লক্ষ্য পরবর্তী নির্বাচন। মেয়েরা রূপান্তরিত হচ্ছে তেঁতুলে আর ছেলেরা রূপান্তরিত হচ্ছে তেঁতুলবাজ মুমিনে, তাতে আপনার কী এসে যায়?
এত বছর টানা ক্ষমতায় থেকে এই নষ্ট প্রজন্মের দায় কী আপনি এড়াতে পারবেন? স্রেফ গুজব রটিয়ে মানুষ খুন করা যায় আপনার দেশে, অথচ বহু বছর ধরে এই দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আপনি। দায় কি আপনার নয়?
এই গলাকাটা প্রজন্ম কার সৃষ্টি? আপনিই কি সেই নেতা নন?

বিপুল পরিমাণ প্রকাশ্য এবং গোপন ট্যাক্স আপনি চাপিয়ে দিয়েছেন সাধারণ মানুষের উপর, কাটছেন গরীবের গলা, মিথ্যে?
আমাদের সেলাই দিদিমণিরা সারাদিন কাজ করে দিনশেষে মাত্র এক ডলার মজুরি পায় সেজন্যেই কি আমরা এত টাকা ট্যাক্স দিই? এটাই কি আপনার সংবিধানের অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার?
একতলা থেকে একটা বালিশ চারতলায় তুলতে সাড়ে সাতশ টাকা খরচ করবেন, সেজন্যই কি ভয়াবহ এক ট্যাক্স-দানবের খপ্পরে আজ বাংলাদেশ?
তিরিশবছর মেয়াদি বিল্ডিং এক বছরেই নষ্ট হয়ে যাবে, আর রাস্তা তৈরি করতে রডের বদলে ব্যবহার করবেন বাঁশ ; সেজন্যই বুঝি আমরা ট্যাক্স দিই!
ধনী চোরদের সরকারি ঋণ আপনি মাফ করে দেবেন, এটাই কি আপনার তথাকথিত সামাজিক ন্যায়বিচার?
বাংলাদেশের কিছুলোক দ্রুত আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাবে, আর গরীব হয়ে যাবে আরও গরীব এই বুঝি আপনার সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি সমাজতন্ত্র?
বহু প্রাইমারি স্কুলের বিল্ডিং নাই, শিক্ষক নাই, শিক্ষকদের বেতন নাই অথচ আপনার পরিকল্পনা তৈরি করবেন আরও আঠারো হাজার নতুন মাদ্রাসা, তৈরি করবেন আরও নতুন জঙ্গি তৈরির কারখানা, তৈরি করবেন আরও নতুন ধর্ষক তৈরির ধর্ষণালয়, সেজন্যই কি আমরা আপনাকে ভোট দিয়েছি?
আমাদের বোনেরা, আমাদের মায়েরা বিদেশে কাজ করতে গিয়ে ধর্ষিত হবে, প্রেগন্যান্ট হয়ে ফিরে আসবে আর আপনারা চুপ করে থাকবেন, এই বুঝি আপনার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা? এই বুঝি আপনার নারী উন্নয়ন?
আপনার মন্ত্রীরা হিন্দুদের মালোয়ান বলে গাল দেবে আর আপনি হয়ে যাবেন নয়া গোলাপী, এই বুঝি আপনার ধর্মনিরপেক্ষতা?
মেয়েদের তেঁতুল বলে অবজ্ঞা করেছে যে হেফাজত, যে হেফাজত নারীবিদ্বেষী সেই হেফাজতের মহাসমাবেশে আপনি একজন নারী হয়েও হবেন প্রধান অতিথি, সেজন্যই বুঝি আপনাকে নারীরা সাপোর্ট দিয়েছিল?
ভোটের কপালে করবেন ঝাড়ুপেটা, আর বলবেন, ভোট আর ভাতের জন্যই আওয়ামী লীগের লড়াই, গণতন্ত্র কি আপনার ব্যক্তিগত সম্পদ?
আপনি মসজিদের দেশে আরও মডেল মসজিদ তৈরি করবেন, বলবেন আমাদের উচিত ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ সাধন, তাহলে কেন এত বাঙালি হওয়ার ভণ্ডামি করেন, বলুন তো!
চায়ের দোকানদার মতি মিয়াও জানে , ইসলাম আপনার নেতৃত্ব বরদাস্ত করে না। আপনি জানেন না?
“জাফর ইকবাল ইসলামের শত্রু, তাই তাকে মেরেছি “, হামলাকারী ফয়জুল যখন একথা বলে তখন আপনি কি দায়িত্ব এড়াতে পারেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?
আপনি বলেছেন,
“দেশ চলবে মদিনা সনদে!” “লেখা‌লে‌খির জন্য কেউ মারা গে‌লে সরকার এ দায় নে‌বে না !” “মুক্তচিন্তার নামে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বিকৃত রুচি!”
ঐ ফয়জুলের বক্তব্যের সঙ্গে আপনার বক্তব্যের পার্থক্য কতটুকু, প্রিয় শেখ হাসিনা?
হেফাজতী ইতরামি আর কত সহ্য করবেন? স্রেফ ব্যক্তি আর দলের স্বার্থে বাঙালিকে আরব আর ঢাকাকে মদিনা বানানোর ষড়যন্ত্র কি আসলে আপনারই? যদি না হয় তাহলে কেন আজকে হেফাজতেরই এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে আওয়ামী লীগ?
কেন বাক স্বাধীনতার উপর আঘাত হানছেন? কেন স্তব্দ করে দিয়েছেন কন্ঠ? কেন গলায় দিয়েছেন চাপাতির কোপ? এই ছাগলের চারণভূমিতে আপনি নিজেও কি নিরাপদ?
আপনি নিজেই বহুবার সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। আজ হঠাৎ চুপ কেন, বলুন তো?
আপনারা কথা দিয়েছিলেন বিএনপি কর্তৃক ব্যাপক নির্যাতনের শ্বেতপত্র প্রকাশ করবেন। সেগুলো ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছেন। বিএনপির প্রতি কিসের এত দরদ আপনাদের? না কি শুধু ক্ষমতার জন্যই বিরোধিতা? আর ভেতরে ভেতরে একই চরিত্র?
প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগকে বিএনপিতে রূপান্তর ঘটাবেন না। আরও একটা বিএনপি আমরা চাই না।
আমরা ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগ চাই।
আমরা সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও বাঙালি জাতিসত্তায় বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ চাই।
আস্থা আর বিশ্বাসের কত আর অমর্যাদা করবেন?
প্রতিনিয়ত বিশ্বাসঘাতকতা করা হচ্ছে আমাদের সঙ্গে। জয়বাংলার নাম নিয়ে আঘাত করা হচ্ছে জয়বাংলার চেতনার উপর। আর কত? আর কত খুন করবেন আমাদের বিশ্বাস?
সিংহাসনের লোভে আর কত দূরে, কত নিচুতে নেমে যাবেন, মহারানি ?

আমরা উন্নত ভবিষ্যতের বাংলাদেশ চাই। আজকের দিনের সকল অন্যায় অবিচার, ভণ্ডামি, প্রতারণা, মিথ্যাচার আর নতুন নতুন কুপ্রথার অবসান চাই। চাই চিন্তার স্বাধীনতা আর মহান সব সম্ভাবনার বাস্তবায়ন। অতীতমুখী নয় চাই ভবিষ্যৎমুখী নতুন সাহসী দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা ও কর্ম।
ইতরের মদিনা ছেড়ে এবার ফিরে আসুন স্বপ্নের ঢাকায়।
ফিরে আসুন জয়বাংলায়।
ধর্ষিতা বাংলা মা এখনও আপনার মুখের দিকেই তাকিয়ে।

হ্যাঁ, ভোট দিয়েছি কিন্তু হুস দিইনি এখনও।
আমরা সরল মানুষ। নির্দ্বিধায় বলে দেব, “রানি, তুই নেংটো! তুই গলাকাটুনী!”

২৭.০৯.২০১৯

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

আপনি কি এই পোস্টটি দরকারী মনে করছেন?

সামাজিক মিডিয়াতে জানান!

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখক দিয়ার্ষি আরাগ

জন্ম ১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭০। নেত্রকোনায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: Content is protected !!