ছবি: বিবিসি নিউজ

কি করে বুঝবেন আপনি করোনা ভাইরাস আক্রান্ত?

()

সাম্প্রতিক সময়ের পৃথিবীজুড়ে সবচেয়ে বড় আতংকের নাম করোনা ভাইরাস বা SERS-CoV-2। আমি নিজেও এই বিষয়ে আতংকিত। আমি গত দুই দিনে এই রোগ বিষয়ে যতটুকু জেনেছি, সেটুকু জানানোর চেষ্টা করেছি যাতে কারো কিছু হলেও উপকারে আসে। যদি ভুল থাকে তাহলে ক্ষমাসুলভ দৃষ্টিতে দেখবেন। যেহেতু আমি নিজের পড়াশুনা জীববিজ্ঞান অনুষদ থেকে করেছি এবং আমার কর্মক্ষেত্র এই বিভাগে, তাই আমার লেখাটাও সাধারণ মানুষ এর জন্য একটু কঠিন হয়ে যেতে পারে।

ছবি: সাইন্স ডিরেক্ট

চীনের উহান শহর থেকে করোনা ভাইরাস এর উৎপত্তি। উৎপত্তিগত দিক থেকে এর সাথে আরো দুইটি করোনা ভাইরাসের (SARS-CoV and MARS-CoV) সাথে এর যথেষ্ট মিল রয়েছে। কিন্তু বর্তমান ভাইরাসটি অন্য দুটি ভাইরাস থেকে একটু পৃথক হওয়ার কারনে এটাকে নবেল করোনা ভাইরাস বলা হচ্ছে।

Serotype and Genotype এর উপর ভিত্তি করে করোনা ভাইরাস’কে চার ভাগে ভাগ করা হয়েছে, α, β, γ, δ. বর্তমান SARS-CoV-2, β গ্রুপের অর্ন্তগত, নতুন এবং ৭ম করোনা ভাইরাস যা মানুষের শরীরে infection সৃষ্টি করে। করোনা ভাইরাস সাধারণত mild upper respiratory tract infection কিন্তু β টাইপ করোনা ভাইরাস মানব শরীরে নিউমনিয়া এবং শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগসহ

ছবি: উইকিপিডিয়া

(Severe Acute Respiratory Syndrome) জটিল রোগ সৃষ্টি করে, উদাহরনস্বরুপ ২০০২-০৩ সালে চীনে SARS এবং ২০১৩ সালে সৌদি-আরবে MARS মহামারি।

যেটা আগেই বলতে চেয়েছিলাম, চীনের উহানে যে নতুন ভাইরাসটি পাওয়া গিয়েছে তার সাথে SARS ভাইরাসের ৪৫-৯০% ভাগ মিল রয়েছে এবং MARS ভাইরাসের সাথে ২০-৬০% ভাগ মিল রয়েছে। আর এটিও SARS ভাইরাসের মত শ্বাসতন্ত্রে রোগ সৃষ্টি করে বলে এর নাম দেয়া হয়েছে SARS-CoV-2। সে যাই হোক, এই ভাইরাসটির সাথে বাদুরের প্রাপ্ত করোনা ভাইরাসের প্রায় ৯৬% মিলে যাওয়ার কারনে ধারণা করা হয় এটি বাদুরের মাধ্যমে মানব শরীরে প্রবেশ করেছে, যদিও এর আসল মাধ্যম এখনও সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

এবার আসি রোগ নির্ণয়ে। কি করে বুঝবেন যে আপনি করোনা ভাইরাস এ আক্রান্ত? রোগটি সম্পূর্ণ নতুন হওয়ার কারণে এখনও সহজ পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়নি। যার ফলে এখনও আমাদের PCR(Polymerase Chain Reaction) বা পলিমারেজ চেইন রিয়াকশন নামক জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ণয় করতে হয়। বিশ্বব্যাপী এই রোগটি ছড়িয়ে পড়ার কারণে এই টেস্ট কিট এর প্রাদূর্ভাব (scarcity) দেখা দিয়েছে। তারপরও লক্ষণ (sign and symptom) বিদ্যমান হলেই করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা উচিত। আবার এই লক্ষণগুলোকে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমভাগে (epidemiological) রয়েছে আক্রান্ত এরিয়াতে ভ্রমন ব বসবাস (History of travel or living in a affected area), আক্রান্ত লোকের সংস্পর্শে আসা (Contact with a patient with COVID-19), বসবাসরত এলাকার মধ্যে কোন আক্রান্ত রোগী থাকা (confirmed case within the immediate surroundings like neighbors, coworkers)। আর দ্বিতীয় ভাগে আছে শারীরিক লক্ষণ। হালকা জ্বর, শুষ্ক কাশি, দূর্বলতা, অবসন্নতা। তবে বয়স এবং শারীরিক অবস্থা অনুসারে লক্ষণগুলো মৃদ্য হতে পারে যেটা পরবর্তীতে নিউমোনিয়ায় রুপ নেয়। আর একটি বিষয় পরিলক্ষীত হয় যে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর প্রথম দিকে শরীরে শ্বেতরক্তকণিকার বিভিন্ন উপাদান কমে যায় (lymphopenia occur at early stage of the disease)।

PCR or Polymerase Chain Reaction কি? এটি হলো এমন একটি পদ্ধতি যা Molecular Biology তে ব্যবহার করা হয় ডিএনএ এর একটি সুর্নিদিষ্ট অংশকে বিবর্ধিত করার জন্য, যাতে ডিএনএ থেকে তথ্যগুলো বের করা যায় (A technique is used to take very small sample of DNA and amplified it to a large enough to study)। বেশীর ভাগ PCR মেথড তাপমাত্রার ওঠানামা (thermal cycling) এর উপর নির্ভর করে।

ছবি: উইকিপিডিয়া

Thermal Cycling বিক্রিয়ককে বারবার চক্রাকারে উষ্ম ও শীতল করার মাধ্যমে তাপমাত্রা নির্ভরশীল বিক্রিয়া ঘটায়, প্রধানত ডিএনএ বিবর্ধন (through repeated cycles of heating and cooling, allowing reactants to undergo different temperature-dependent reactions, especially DNA melting and enzyme driven DNA replication)। আর এ কাজে Thermal Cycler নামক বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়।

কোয়ারিন্টাইন পিরিয়ড ১৪ দিন কেন? সাধারনত করোনা ভাইসাস এর গড় সুপ্তিকাল (incubation period) ৬.৪ দিন (২.১ দিন থেকে ১১.১ দিন) বলে রাখা ভালো সুপ্তিকাল হলো – কত দিন ভাইরাসটি কোন লক্ষণ প্রকাশ না করে শরীরে থাকতে পারে। WHO সব কিছু বিবেচনা করে সন্দেহজনক ব্যক্তি কে ১৪ দিন কোয়ারিন্টাইন থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

এখন আসি ল্যাব টেস্ট নিয়ে। করোনা আক্রান্ত রোগীর ল্যাব টেস্ট করলে কি ধরনের ডাটা পাওয়া যাবে? বলে রাখা ভালো আমি এখন যে সব ডাটা উপস্থাপন করছি সবগুলো বিভিন্ন বিজ্ঞান সাময়িক থেকে নেয়া, আমি সব গুলোর রেফারেন্স লিংক সবার শেষে দিয়ে দিবো। আর এই তথ্যগুলো দিচ্ছি কারন এই তথ্যগুলো সঠিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। তারপরও প্রতিনিয়ত আমরা নতুন তথ্য জানতে পারছি। আমাদেরকে অবশ্যই upto date থাকতে হবে।

করোনা আক্রান্ত রোগীর শুরুর দিকে সাধারণত শ্বেতরক্তকণিকার বিভিন্ন উপাদান সংখ্যা কমে যায় (Leukopenia and Lymphopenia are characteristics in initial stage of COVID-19 infection), কিন্তু ২৫-৩০% রোগীর ক্ষেত্রে এর বিপরীত অর্থাৎ শ্বেতরক্তকণিকার সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে (Leucocytosis)। আক্রান্ত রোগীদের মাঝে সাধারণত বিভিন্ন এনজাইম AST, ALT, CPK, LDH এর কার্যক্রম বৃদ্ধি (increased activity) দেখতে পাওয়া গেছে, myoglobin এবং কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে troponin বেড়ে যায়। বেশীরভাগ রোগীর ক্ষেত্রে CPR level বৃদ্ধি, যদিও Procalcitonin level স্বাভাবিক পাওয়া গেছে।

তীব্র আক্রান্ত রোগীদের (patient developing severe infection) ক্ষেত্রে, increased D-dimer, creatinine level, leucocytosis with agranulocytosis and lactate level বৃদ্ধি পায়। এছাড়া তীব্রভাবে আক্রান্ত রোগীদের মাঝে cytokines (IL-2, IL-7, IL-10, GSCF, IP10, MCP1, MIP1a and TNF-α) পরিমান বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।

CT scan করোনা ভাইরাস নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটা এই জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে, উপসর্গসহ যে সব রোগীর ফুসফুসে পরিবর্তন পাওয়া গেছে, তাদের মধ্যে ৮০-১০০% ভাগই করোনা টেস্টে পজিটিভ ফলাফল পাওয়া গেছে।

ছবি: রিভিয়ার হেলথ

Radiological Society of North American এর মতে যেহেতু molecular test সংখ্যা আমাদের হাতে কম, যার কারনে CT scan করোনা ভাইরাস নির্ণয়ে অত্যাবশকীয় ভূমিকা পালন করতে পারে। ফুসফুসের CT scan এর উপর ভিত্তি করে infection কে ৫ (5) টি পর্যায় চিহ্নিত করা হয়েছে। আমি এটা বাংলা করতে চাই না কারণ জীববিজ্ঞান অনুষদের বাইরে এটা বুঝার কথা না, তাই সরাসরি দিয়ে দিলাম –

  1. Ultra-early stage, still without clinical manifestations or laboratory deviations. The chest examination reveals single or diffuse foci of clouding, enlarged lymph nodes in the middle sections of the lungs, often surrounded by circular opacities; consolidations may occur. Air bronchogram becomes visible.
  2. Early stage, observed within 1–3 days of the onset of symptoms. As a result of dilatation and hyperaemia of the alveolar-capillary membrane, an exudate into the lumen of the alveoli and a picture of interstitial oedema are observed.
  3. The third stage is characterized by rapid progression of changes. In the period of 3–7 days from the onset of symptoms, the changes described in the second stage intensify, which results in increased alveolar and interstitial oedema, moreover, merging consolidations with air bronchogram are visible.
  4. The fourth stage is the stage of consolidation lesions – they occur as a result of fibrin deposition in the lumen of the alveoli and in the interstitium.
  5. In the fifth stage consolidation, the changes evolve – interlobular septal thickening and striped densities, spreading along the bronchi are visible

যাইহোক, অনেক কিছু আজ লিখেছি। কাল কেইস হিস্ট্রি এবং ঔষধ নিয়ে (case history and medicine used in this infection) লেখার ইচ্ছা আছে।

 

লেখকঃ মোঃ মঞ্জুর রহমান সাদ্দাম, জীববিজ্ঞান নিয়ে বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

লেখাটি কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার উপরে এই লেখার মোট রেটিং দেখুন

এখন পর্যন্ত কোনও রেটিং নেই! এই পোস্টটি রেটিং করুন

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

লেখক অতিথি লেখক

অতিথি লেখকদের ব্লগপোষ্ট এই একাউন্ট থেকে প্রকাশিত হবে

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: এই ব্লগের লেখা কপি করা যাবে না