শুক্রবার , আগস্ট ২৩ ২০১৯

আমি আদর্শবাদী নই, বাস্তবিক

আমরা ঠিক করেছি শোষণহীন সমাজের আদর্শ কমিউনিজম। এখানেই আমার আপত্তি। কারণ মার্কসের আগে সমাজবাদী ও সমাজতন্ত্রীরা আদর্শ বলতে নৈতিক, শুদ্ধ মঙ্গলকর সমাজের কথা চিন্তা করতেন। এবং তার জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন। মার্কস এই আদর্শবাদকে খারিজ করে দিয়েছেন। বরং বাস্তব সংকট পুঁজি, মুজরি ও সেলামির বিলোপ চান। তিনি বদলে দিতে বলেন বাস্তবতাকে। স্বাভাবিক ভাবেই পুঁজি না-থাকলে, সেখানে সামাজিক প্রক্রিয়া চালু হবে, সেইটাই তখনকার বাস্তবতা। এইটা বস্তুগত অধ্রুব সত্য। এখানে আদর্শের কোন বিষয় নেই। মার্ক্সবাদীদের নিকট বাস্তবতাটাই গুরুত্বপূর্ণ। এরা চান সহৃনিয় বাস্তবতা। কিন্তু মার্কসকে যথার্থ উপলদ্ধি না করায় কমিউনিস্টরা এখনো পুরানো আদর্শবাদী চিন্তা দূর করতে পারেনি। আপনি যে বলতেছেন, বাস্তবতার সাথে আদর্শ বদলায়।

এই কথাটা সামগ্রিক অর্থে ঠিক নয়। কারণ আদর্শ বলতে একটা ধ্রুব সত্যকে বুঝায়। এই আদর্শিক সত্যের আলোকে মানুষ জীবনকে গড়ে তুলবে। এবং এই আদর্শ হল বিশ্বাসের ব্যাপার। ব্যক্তি নিজে বিশ্বাস করবে এবং অন্যকে বিশ্বাস করতে উদ্ভুত করবে। আর আপনি যদি মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যান এবং বলেন এইটা আপনার আদর্শ, তা আপনিগণ প্রচার করতে পারেন কিন্তু লোকসমাজ এই কথা বিশ্বাস করবে না, এবং করেনা বলেই লোক ভিড়ে না। অপরদিকে সৃষ্টিবাদীরা আদর্শকে ধ্রুব সত্যে বলে লোকদের দীক্ষা দেয়, এবং তাদের জীবন যাপনে, আচরণে তার আদলে সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। ঠিক বা বেঠিকের আলাপে যাবনা কারণ তাদের সংস্কৃতির ব্যবহারিক মূল্য আছে। এছাড়া মার্কসবাদেও সত্যের মানদণ্ড নেই। শ্রমকে স্বীকার্য সত্য ধরে ব্যাখ্যা করা হয়। এবং নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে উদ্ভুদ করে। সৃষ্টিবাদীদের আদর্শ এই কারণে অস্বীকার করি তা হচ্ছে, এরা পরিবর্তনকে স্বীকার করে না। যা সবটুকুই অবাস্তব কথা। মূর্খ, সহজ-সরল, অলস ও হতাশ মানুষ গুলো স্থির হতে পছন্দ করে। যা আছে তাকে আখরে ধরে বাঁচতে চায়। এর জন্য এরা অপরিবর্তনীয় বিশ্বাসের দিকে, আদর্শের দিকেই বেশী আগ্রহী।

যাক আমি আপনার সাথে এখানে একমত, “আদর্শ একটি ভাববাদী বিষয়”। তবে ভাববাদী দর্শনে আদর্শ অপরিবর্তনীয় এখানে কিছু আলোচনা সাপেক্ষে সহমত। কারণ ভাববাদী দার্শনিকরা পরিবর্তনকে অস্বীকার করে না। বরং এইটা হবে সৃষ্টিবাদ। সৃষ্টিবাদীরা আদর্শ কে অপরিবর্তনীয় মনে করে। তবে ভাববাদীরা পরিবর্তনে বিশ্বাসী হলেও তাদের একটা আদর্শ আছে। কারণ তারা মূল্যবোধ, নীতিজ্ঞ-নীতিমালা, শুদ্ধতা ও নৈতিকতা কে অপরিবর্তনীয় বলে গণ্যকে। কেউ কেউ আত্মাকে সত্য ভাবে, শুদ্ধ মানবের বক্তব্যকে পবিত্র ও বক্তাকে আদর্শিক পিতা ভাবে। এক সময় এমন আদর্শিক সমাজের স্বপ্ন দেখেছে সমাজতন্ত্রীরাও। তাই আমি মনে করি এইরূপ আদর্শবাদ চিন্তা থেকে মুক্তি অর্জন করা প্রয়োজন। এবং বাস্তবতাকে বদলাতে লিপ্ত হতে হবে। আপাতত এখানে নৈতিকতার, শুদ্ধতার বালাই নেই। এই বলে শেষ করি শোষণহীন সমাজ হলে কি হবে? তা ভাবার দায়িত্ব দার্শনিকদের এবং তারাই ব্যাখ্যা করবে।

আমি মার্কসের ছাত্র। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন, এখন ব্যাখ্যা করার সময় নয়, বদলাতে মনোযোগ দাও, এই পুঁজি, মজুরির ব্যবস্থাটাকে। আর এই ব্যবস্থা না থাকলে তখন সম্পত্তি মাত্রই সামাজিক হয়ে যাবে। কিন্তু আমাদের দেশে পুঁজি যথেষ্ট বিকাশ হয়নি, সামন্তপ্রথা, পিতৃতান্ত্রিকতা, ধর্মীয় ধ্যাণ-ধারণা দূর হয়নি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই। তাই আমি আজকের বাস্তবতায় গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে যথার্থ উপায় বলে মনে করি। সেইক্ষেত্রে আমি আদর্শবাদী নই। বলতে পারেন বাস্তববাদী। ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাই, এক বাস্তব সংকট দূর হলে পরবর্তী সংকট দূরকরণের শপথ নেই, ততটুকুই স্থির (আপনাগণের মতে আদর্শিক) যতক্ষণ বাস্তবতা না বদলাচ্ছে তাই আমি ঐত্যিহাসিক দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার মোর্শেদ হালিম

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!