আমাদের পর্ণ আসক্তি ও ভুল যৌনশিক্ষা

১২ বছর বয়েস থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত পর্ণ দেখার অভিজ্ঞতা সকল ছেলে-মেয়ের থাকার কথা।Sexuality Information and Education Council of the United States (SIECUS) এর জরীপে এ তথ্য উঠে আসে। ইন্টারনেটের সহজ প্রাপ্যতা পর্ণ দেখাকে আরো সহজলভ্য করেছে। মূলত এ বয়সে স্বাভাবিক পর্ণগুলো দেখে ছেলে-মেয়েরা যৌন চাহিদা বহিঃপ্রকাশ ঘটায় হস্তমৈথুনের দ্বারা। এটা খুব সত্য যে কেউ পর্ণ দেখার অভিজ্ঞতা অস্বীকার করলে সে মিথ্যে বলছে না এমনটা বলা যায় না। শেষ বছর গুগলের তথ্যমতে সবচেয়ে বেশি সার্চ করা কিওয়ার্ড হলো সেক্স অথবা sex যা বাংলাদেশ এবং পার্শ্ববর্তী ভারতে বেশি। একটা সময় ছিলো মানুষ পর্ণ উপভোগ করতো প্রিন্ট মাধ্যমে যা টিনএজারদের সহজলভ্য ছিলো না। পর্ণসাইটগুলোর মাধ্যমে যেহেতু বর্তমান সময়ের ছেলে-মেয়েদের যৌনচিন্তা বা আবেগ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে সেহেতু পর্ণসাইটগুলো যেভাবে তাদের পর্ণকে উপস্থাপন করছে ঠিক তার বাইরে কিছু ঘটছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের গাইনোকোলজিস্টদের একটা টিম ২০১৪ সালে আরেক জরীপ চালায় পর্ণসাইটগুলোর কন্টেন্ট এর উপর, সেখানে দেখা যায় বেশিরভাগ ভিডিওতে নারীর স্তনকে প্রধান করে কিংবা ওরাল সেক্সকে হাইলাইট করা হয়েছে। এক কথায় এই পর্ণসাইটগুলোর ভিজিটর যারা তাদের সেক্সুয়াল থড স্তন আর ওরাল সেক্সকে ঘিরে গড়ে উঠছে। তাছাড়া নারী-পুরুষের সাধারণ যৌন আকাঙ্ক্ষাও অতিরিক্ত পর্ণ আসক্তির কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে ঐ রিপোর্টে প্রকাশ করা হয়। আবার মনোবিজ্ঞানীদের বড় একটি অংশ পর্ণ আসক্তিকে স্থায়ী যৌনরোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

বাংলাদেশ এবং ভারতের বেশিরভাগ ১২ থেকে ১৮ বছরের ছেলে-মেয়েদের পছন্দের পর্ণ হিসেবে স্ট্যাবিলিশড পর্ণ ইন্ডাস্ট্রির ফিল্মগুলোয় প্রথম কাতারে। আবার একই জরীপে দেখা যায় ১৮ থেকে ২৫ বছরের ছেলে-মেয়েদের পর্ণ আসক্তি কম হলেও তাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে হোমমেড যা বাস্তবিক কল্পনাশক্তির আওতাভুক্ত পর্ণ। যদিও একই গবেষণায় বলা হয়েছে বেশি আর কম আসক্তির পারসেন্টিজ অনেকাংশে কম। ছেলেদের যৌনচাহিদা মেটে মূলত টয়লেটে পর্ণ দেখে হস্তমৈথুনের মাধ্যমে কিংবা একা ঘরে অন্ধকারে দীর্ঘক্ষণ পর্ণ দেখে যা শারীরিক অক্ষমতা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয় বলে মত প্রকাশ করে থাকেন মেডিকেল সাইন্স।

নারীদের স্তন নিয়ে নিজেদের চিন্তাভাবনা নিয়ে জরীপ চালানোর জন্য ইন্দুবালা নামে এক মহিলা একটি ইভেন্ট করেছিলো যাতে বিভিন্ন নারীদের আহবান করা হয়েছে নিজেদের স্তন নিয়ে অভিজ্ঞতার কথা তারা যাতে শেয়ার করে এবং চাইলে নিজেদের স্তনের ছবিও তারা পাঠাতে পারে। সেখানে বেশিরভাগ নারীর মন্তব্য এমন ছিলো যা পূর্ব পর্ণ সাইটের ভিডিও কন্টেন্ট এর উপর চালানো জরীপের চাহিদার সাথে মিলে যায়। প্রায় ৪৪ শতাংশ নারী তাদের স্তন ছোট হওয়ায় মানসিক চিন্তায় ভোগেন আবার ৩৩ শতাংশ নারী তাদের স্তন বড় হওয়ার চিন্তায় ভোগেন। অনেক মেয়ে নিজেদের স্তন নিয়ে গল্প লিখতে গিয়ে বলেন তারা যখনই কোন পুরুষের সামনে যান পুরুষের চোখ সবচেয়ে বেশি সময় ধরে থাকে তাদের স্তনের উপর। বর্তমানে নারীর মূল যৌনতার কেন্দ্র স্তন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাচ্ছে। মূলত মিডিয়া এবং পর্ণসাইটগুলো তাদের কন্টেন্ট তৈরির মূল বিষয় হিসেবে নারীর স্তনকে হাইলাইটের ফসল এই মন্তব্য।

উপরের বেশিরভাগ তথ্য বিভিন্ন সময়ের জরীপের মন্তব্যসমূহ। এসব জরীপের উপর ভিত্তি করে বলা চলে বর্তমান সময় এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে নারী-পুরুষের যৌনচিন্তা কিরকম হবে তা নির্ধারণ করে দিচ্ছে পর্ণসাইটগুলো এবং সেভাবেই মানুষ পরিচালিত হচ্ছে। তাছাড়া স্বাভাবিক সেক্স এর বিপরীত বিভিন্ন চিত্রকে জনপ্রিয় করে তুলছে সাইটগুলো। অনেক ক্ষেত্রে পর্ণের সহজলভ্যতা স্বাভাবিক সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স থেকে এসল্ট বা রেপ সংগঠনের বৃদ্ধির প্রধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অতিরিক্ত পর্ণ আসক্তির কারণে রিয়েল লাইফ সেক্সে নারী এবং পুরুষ উভয়েই অর্গাজম পান না বলে দাবি করে মেডিক্যাল সাইন্স। তাছাড়া আমাদের মধ্যে যথেষ্ট যৌনজ্ঞানের অভাব আর জানতে এবং অন্যকে জানানোর লজ্জাও আমাদের যৌনজীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ। আমাদের যৌনশিক্ষা ছোট বাচ্চাদের কম্বলমুড়ি দিয়ে ভূতের ফিল্ম দেখার মতো হয়ে গেছে। কম্বলমুড়িও দিবো আবার ভয় পেতে পেতে ভূতের মুভি দেখবো। আমাদের যৌনশিক্ষা আটকে আছে চটি গল্প আর পর্ণের মধ্যে। আনাফ্রাঙ্কের ডায়েরীর ১৪ পৃষ্টায় তার নিজের যৌনজীবন সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে আনা বলেন ১৪ বছর বয়সে পিরিয়ড শুরু হলে একজন নারী কেবল যৌনমিলনের জন্য প্রস্তুত হন। তখনকার নাৎসিদের সময়ে থেকেও আনা কি পরিমাণ সূক্ষ্ম যৌনশিক্ষার মেসেজ তার ডায়েরীতে লিখেছেন তা কেবল ১৪ পৃষ্টার পর থেকেই বুঝা যায়।

বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল একটি দেশে যৌনশিক্ষাকে জনসমক্ষে আনতে চাওয়াও আমাদের বড় বোকামি। ধর্মপ্রাণ বাঙালির মতে লুকিয়ে লুকিয়ে সেক্স করা জায়েজ, কিন্তু সেক্সের ভালো-খারাপ দশজনের সামনে আলোচনা হারাম। উন্নত দেশগুলোয় প্রাইমারির পর থেকে যৌনশিক্ষা দেওয়া হয় যা তাদের পরবর্তী জীবনে খুবই ইফেক্টিভ হয়ে থাকে। যৌনশিক্ষার দ্বারা বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, ধর্ষণের মতো বিষয়গুলো ঠেকানো যায়। সি আই ইসি ইউ এস যুক্তরাষ্ট্রের যৌনতা তথ্য ও শিক্ষা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী ৯৩% বয়স্ক ব্যক্তিরা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে যৌনতা শিক্ষা সমর্থন করে এবং ৮৪% নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে এটি সমর্থন করে। আবার জাপানে যৌনশিক্ষা ১০ থেকে ১১ বছরের মধ্যে বাধ্যতামূলক, প্রধানত জৈবিক বিষয়গুলো যেমন ঋতু এবং উল্লাসধ্বনি। সে হিসেবে এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে কোন যৌনশিক্ষার ব্যবস্থা নেই বলে কিশোরীরা নিজের পরিবারের কাছেও তাদের ঋতুর কথা পর্যন্ত বলতে লজ্জা পায়।

কথা হলো কম্বলমুড়ি দিয়ে ভূতের ছবি দেখতে দেখতে ভয় পাওয়া মানুষগুলো জানে এবং বুঝে তাও ভয় পেতে তারা ভালোবাসে। উপরের জরীপে দেখা যায় বাংলাদেশ নারী-পুরুষের পর্ণ আসক্তি কি লেভেলের বা যৌনশিক্ষার অভাবোধ। যেখানে গুগল কিংবা পর্ণ সাইটের মাধ্যমে যৌনতা নিয়ে মানুষ ডাইবার্ট হয়ে ভুল ট্র‍্যাকে যাচ্ছে সেখানে সঠিক যৌনশিক্ষা প্রদান কি বাধ্যতামূলক নয়?

[ তথ্যসূত্র: যৌনবিজ্ঞান, উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, জার্নাল, সাক্ষাতকার]
ভালো লাগলে শেয়ার করুন

ব্লগার শিপ্ত বড়ুয়া

শূন্য দশকের অপরাধ

মন্তব্য করুন

error: Content is protected !!