আমরা পুঁজিবাদী অর্থনীতির পোষা প্রভুভক্ত কুকুর

লিবিডিনাল অর্থনীতি (Libidinal Economics) হল বর্তমান পুঁজিবাদী অর্থনীতির মূলপ্রান। যে বাজার স্বাভাবিক নারীদেহকে রহস্যময় করে তোলে এবং পুরুষের স্বাভাবিক যৌনবাসনাকে অতিরঞ্জিত করে তোলে এবং সেই রহস্যময়তা ও অতিরঞ্জিতকরন-কে কেন্দ্র করে পণ্য উৎপাদন এবং বিক্রয় করে তাকে লিবিডিনাল অর্থনীতি বলে। লিবিড়ো (Libido) শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন জিগমুণ্ড ফ্রয়েড যার অর্থ হল যৌন আনন্দ। লিবিডিনাল অর্থনীতির মূল পণ্য হল-পর্ণ ইন্ডাস্ট্রি, সেক্স টয়, ব্রা, প্যানটি, বিভিন্ন রকম কসমেটিক, বিউটি পার্লার, কনডম, ফেমিকন ইত্যাদি। মোটকথা নারীদেহকে রহস্যময় করে তোলা এবং নারীদেহের প্রতি পুরুষের কামনাকে অতিরঞ্জিত করা হল লিবিডিনাল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।

নারী দেহ এবং নারী দেহের প্রতি পুরুষের আকর্ষণ খুবই স্বাভাবিক। নারী বিভিন্ন মাধ্যমে পুরুষকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করবে আবার পুরুষ নারীকে বিভিন্নভাবে আকর্ষণ করার চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু পুরুষ নারীদেহকে কিভাবে বা কোন দৃষ্টিভঙ্গি (perception) থেকে দেখবে, নারী পুরুষকে কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আকর্ষণ করার চেষ্টা করবে (perception) সেটা একটা বিরাট রাজনীতি এবং অর্থনীতি। উক্ত রাজনীতি এবং অর্থনীতিতে একজন নারী একজন পুরুষের দেহকে কোন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ডিল করবে সেটা মুখ্য নয় বরং একজন পুরুষ একজন নারীকে কিভাবে দেখবে সেটাই মুখ্য বিষয় কারন আধুনিক পৃথিবী এখনো পুরুষশাসিত। এই পুরুষ শাসনের মূল হাতিয়ার হল মিডিয়া, সিনেমা, নাটক, গান, কবিতা, আর্ট ইত্যাদি। আধুনিক মিডিয়া এবং সিনেমা জগতে নারী দেহের যে অঙ্গটিকে নিয়ে পুরুষতান্ত্রিক কামনা জগতে সবচেয়ে বেশী আবেদন তৈরি করা হয় এবং ব্যবসা করা হয় সেটা হল নারী স্তন (Breast)।

নারী স্তনের বিভিন্ন মাত্রার উপস্থাপনের উপর নির্ভর করে বর্তমান অধিকাংশ মুভি, বিজ্ঞাপনের সফলতা, শৈল্পিকতা, ফ্যাশন, আধুনিকতা ইত্যাদি। রাবিন্দ্রিক যুগে পুরুষের কামনার কেন্দ্রস্থল ছিল নারী চোখ, নাক, চুল, হাসি ইত্যাদি এবং এসব নারী অঙ্গকে কামনার কেন্দ্রস্থলে পরিনত করেছিল তৎকালীন গান, কবিতা, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি মিডিয়া। বর্তমান যুগের পুরুষের কামনার কেন্দ্রস্থল হল নারী স্তন এবং এই নারী স্তনকে কামনার কেন্দ্র স্থলে পরিনত করেছে বর্তমান সিনেমা, গান, নাটক, বিজ্ঞাপন, পর্ণ ইত্যাদি মিডিয়া।

বর্তমান মিডিয়া নারী স্তনের প্রতি পুরুষের মাঝে মাত্রাতিরিক্ত/ অতিরঞ্জিত কামনা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে এবং এই অতিরঞ্জিত কামনার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে বিশাল একটি অর্থনীতি যার নাম লিবিডিনাল অর্থনীতি। অথচ নারী স্তন অন্যান্য অঙ্গের মতই একটি স্বাভাবিক অঙ্গ। হাত-পা-কান- নাকের মতই স্বাভাবিক একটি অঙ্গ। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ‘স্তন‘’ নামক এই স্বাভাবিক অঙ্গকে দিনের পর দিন এমন রহস্যময় করে তুলছে যা এক ধরনের গ্লোবাল মানসিক ডিসঅর্ডার ছাড়া আর কিছুই নয়।

আপনি-আমি- নারী- পুরুষ সবাই কম বেশী এই ডিসঅর্ডারের রোগী। আপনি যে একজন পরিপূর্ণ মানসিক যৌন রোগী এটা টের পাবেন তখনই যখন আপনি বান্দরবনের কোন একটি ম্রো পাড়ায় বেড়াতে যাবেন। সেখানে নারীরা মুক্ত বক্ষ/ স্তন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কাজকর্ম করছে, সন্তানকে দুধ খাওয়াচ্ছে আবার যখন ইচ্ছা তখন কাপড় দিয়ে স্তন গুলো ডেকে রাখছে। এটা নিয়ে কোন পুরুষের মাথা ব্যথা নাই, কোন নারীরও মাথা ব্যথা নাই। কারন উভয়ই স্তনকে ধরে নিচ্ছে একটি স্বাভাবিক অঙ্গ হিসেবে। এর বেশী কিছু না। সেখানে কোন মিডিয়া নাই তাই নারী স্তনের উপর অতিরঞ্জিত কোন কামনা পুরুষের ভেতর এখনো তৈরি হয় নাই। আর আপনি যেহেতু একজন মানসিক রোগী সেহেতু ঐ মুক্ত স্তন দেখে হয় আপনি ভেতরে ভেতরে উত্তেজনা বোধ করবেন, অন্যথা কয়েক মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিবেন আর এমন ভান করবেন যে আপনি- আপনি ঐ স্তন গুলো দেখেন নাই। হা হা।

অন্যদিকে বাঙালি কর্মব্যস্ত নারীর একটি দিনের বড় সময় কেটে যায় ওড়না সামলাতে সামলাতে, নিজের দুটি স্তনকে পুরুষের কামনা থেকে রক্ষা করতে করতে, আর বাঙালি পুরুষের দিন কেটে যায় একটু যদি দেখা যায়, একটু যদি ছুয়ে দেয়া যায় এই ধান্দায় কারন আমরা আধুনিক, আমরা সভ্য, আমরা মিডিয়ার ওরসজাত সন্তান,আমরা পুঁজিবাদী অর্থনীতির পোষা প্রভুভক্ত কুকুর।।

লেখক: লিটন বড়ুয়া।

শেয়ার করুন

ব্লগার আমার কলম

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।